তন্ময় উদ্দৌলা, ফরিদপুর
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৪, ০১:২৫ পিএম
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৪, ০২:০১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

শিশু আহাদের দাফন দিয়ে বাড়িতে শুরু পারিবারিক কবরস্থানের

আয়কর বিভাগের উচ্চমান সহকারী আবুল হাসানের ছেলে আহাদ। ছবি : সংগৃহীত
আয়কর বিভাগের উচ্চমান সহকারী আবুল হাসানের ছেলে আহাদ। ছবি : সংগৃহীত

১৯ জুলাই, পড়ন্ত বিকেল। রাজধানীর একটি ভবনের ৮ তলার বারান্দা। এক পাশে বাবা, আরেক পাশে মা। আর মাঝে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শিশু আবুল আহাদ। তাদের তিন জোড়া চোখ নিচের দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে। কেননা, তখন বাসার নিচের রাস্তায় কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

এরই মাঝে আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে শিশু আহাদ। বাবা আবুল হাসান ভেবেছিলেন, ছেলে হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কিন্তু না। ছেলেকে তুলে ধরতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় বাবার। ততক্ষণে রক্তে ভেসে যাচ্ছে ছেলেটার চোখ, মুখ ও মাথা। ডান চোখে বিদ্ধ গুলি আটকে গেছে শিশুটির মাথায়। রক্তাক্ত ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসেন আবুল হোসেন। কিন্তু সেখানেও বাধার মুখে পড়েন অস্ত্রধারীদের। শিশুটির রক্তাক্ত শরীর দেখে অবশেষে সরে দাঁড়ান তারা। এরপর আহাদকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইসিইউ)। লাইফ সাপোর্টে।

চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির মাথার মধ্যে গুলি আটকে আছে। কিন্তু কোন অবস্থানে আছে, তা বোঝার জন্য সিটিস্ক্যান করতে হবে। কিন্তু সিটিস্ক্যান করতে নেওয়া হলে আইসিইউর যন্ত্রপাতি খুলে ফেলতে হবে। এতে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। তবে সিটিস্ক্যান করাও জরুরি। অবশেষে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় নিষ্পাপ শিশু আবুল আহাদের।

এদিকে শুক্রবার (২৬ জুলাই) শিশু আহাদের আত্মার শান্তি কামনায় তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বাদ জুমা দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় পুখুরিয়া গ্রামের ৮টি মসজিদে মিলাদ মাহফিল এবং দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

শিশু আহাদের পিতা আবুল হাসান আয়কর বিভাগের উচ্চমান সহকারী। তাদের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের পুখুরিয়া গ্রামে। আবুল হাসান ও সুমি আক্তার দম্পতির দুই ছেলে দিহান মাতুব্বর (১১) ও ছোট ছেলে আবুল আহাদকে (৪) নিয়ে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকার ১১তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ির আট তলায় থাকতেন। সাজানো গোছানো সংসারে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন যাচ্ছিল আবুল হাসানের। কিন্তু হঠাৎ দুঃস্বপ্নের মতো ভেঙে গিয়েছে তার সমস্ত স্বপ্ন।

নিহত শিশু আহাদের চাচা মোখলেসুর রহমান বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরদিন শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আহাদকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার দুপুর ৩টার দিকে আহাদের মরদেহটি আমরা বুঝে পাই। তারপর অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গ্রামের বাড়ি ভাঙ্গার পুখুরিয়া গ্রামে চলে আসি । বাদ মাগরিব পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় আহাদকে।

আবেগভরা শোকাতুর কণ্ঠে মোখলেসুর বলতে থাকেন, বাড়িতে আগে পারিবারিক কবরস্থান ছিল না। আহাদকে দাফনের মধ্য দিয়েই কবরস্থানটির যাত্রা শুরু হলো।

কোনোভাবেই যেন মানতে পারছেন না আবুল হাসান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নির্মমতার শিকার হয়ে আমার ছেলেটা চলে গেল। এ নিয়ে আমি আর কী বলব! চেয়েছিলাম পোস্টমর্টেম না করাতে। অতটুকু শরীরে যাতে আর কাটাছেঁড়া করা না হয়, কিন্তু আমাদের সে চেষ্টাও সফল হয়নি।’

এলাকার দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য না পাওয়া গেলেও শোকের নিস্তব্ধতা যেন পুকুরিয়া গ্রামের পুরো এলাকাজুড়ে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে এভাবে পিতার কাঁধে শিশুপুত্রের লাশ! কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে আর খালি না হয়, তাই এ ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক- এমনটাই দাবি এলাকার সর্বসাধারণের।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

ঘটনাপ্রবাহ: কোটা সংস্কার আন্দোলন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারীদের সব বিউটি পার্লার বন্ধের নির্দেশ তালেবানের

ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে চীনের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ

মতিঝিলে কালবেলার সাংবাদিকের ওপর হামলা

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস / গুম থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান

নুরের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জামায়াতের

দেশ কে চালাচ্ছে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে : ইসলামী আন্দোলন

মঞ্চে আপত্তিকর স্পর্শ, ইন্ডাস্ট্রি ছাড়ার ঘোষণা অভিনেত্রীর

লিটনের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে সহজ জয় বাংলাদেশের

ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম

ট্রাম্পের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে, কী ঘটেছে?

১০

নির্বাচনে সমতল জনগোষ্ঠীর সমর্থন চায় বিএনপি : তারেক রহমান

১১

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাহমুদ উল্লাহর ইন্তেকাল

১২

বড় পর্দায় আসছেন প্রভা

১৩

‘শক্তি থাকলে আসুক, হাত-পা ভেঙে দেব’, হুঁশিয়ারি জাপা নেতার

১৪

বাংলাদেশিরা ৫ কর্মদিবসেই পাবেন যুক্তরাজ্যের ভিসা, তবে...

১৫

নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবি পার্টির বিক্ষোভ

১৬

যে কারণে আগামী মৌসুমে রিয়ালকে আতিথেয়তা দিতে পারবে না লিভারপুল

১৭

দত্তক নিয়ে ৩ সন্তানের মা সানি কেন নিজে গর্ভধারণ করেননি

১৮

১৭তম সন্তানের জন্ম দিলেন ৫৫ বছরের নারী!

১৯

দেশের দুঃসময়ে জিয়া পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য : আমান

২০
X