ধবধবে একটি সাদা ব্যান্ডেজের ওপর লেখা, ‘হাড় নেই, চাপ দেবেন না’। এমন একটি ছবি হাতে নিয়ে বিলাপ করছেন নিহত ফয়সালের বৃদ্ধা মা হাজেরা বেগম। তার আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। পাশে বসে কাঁদছেন ফয়সালের বাবাসহ তার ছয় বোন ও আত্মীয়স্বজন। তার শোকে কাঁদছেন প্রতিবেশীরাও।
গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে ফয়সালের মা হাজেরা বেগম বলছেন, ‘আমার ছেলের জীবনডারে কেউ ভিক্ষা দাও, আহারে আমার নিমাইরে এমনভাবে গুলি করছে যে মাথা মগজও উড়ে গেছে। কোন পাষণ্ড আমার ছেলেরে গুলি করছে, তার কি একটুও বুক কাঁপল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পোলারে কত জায়গায় খুঁজছি, কেউ বলতে পারেনি কই আছে, থানায় গিছি, এই হাসপাতালে, ওই হাসপাতালে ঘুরছি, কোথাও পাইনি, ১৩ দিন পর জানছি, আমার ছেলেরে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করছে। আমার মানিক চানরে কই দাফন করছে তাও জানি না। কবরে দাঁড়াইয়া যে ফয়সাল বইল্ল্যা ডাক দেমু তাও পারমু না, আরে ফয়সালরে তুই গিয়া শুইয়্যা আছত’।
শুক্রবার (২ আগস্ট) বেলা ১১টায় ফয়সালের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র।
নিহত ফয়সাল সরকার কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ ইউনিয়নের কাচিসাইর গ্রামের সরকার বাড়ির মো.সফিকুল ইসলাম সরকারের ছেলে। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল সে। এরই মধ্যে আট বিষয়ে পরীক্ষা শেষ করেছে। পাশাপাশি সংসারের অভাব ঘুচাতে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করত। বাবা-মা, ভাইসহ পরিবার নিয়ে থাকত আবদুল্লাহপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায়।
নিহত ফয়সালের ছোট ভাই ফাহাদ সরকার জানায়, গত ১৯ জুলাই বিকেলে আবদুল্লাহপুরের শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে যাবেন বলে বাসা থেকে বের হন। সন্ধ্যার পর ভাইয়ের নম্বরে ফোন করলে নম্বর বন্ধ পাই। এরপর আমরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করি। বাইরে তখনও গোলাগুলি চলছিল। কোথাও খোঁজ না পেয়ে ২৮ জুলাই দক্ষিণখান থানায় জিডি করি। গত ১২ দিন ঢাকার এই হাসপাতালে ওই হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি করেছি, কোথাও হদিস পাইনি। পরে বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) বিকেলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে খোঁজ নিলে তারা বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা মরদেহগুলোর ছবি দেখালে সেখানে ফয়সাল ভাইয়ের মরদেহের ছবি দেখতে পাই। কোথায় দাফন করা হয়েছে জানতে চাইলে তারা জানায়, ১৫/২০টি লাশ একবারে গণকবর দেওয়া হয়েছে, কাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে তারা তা জানেন না।
ফয়সালের বড় বোন রোজিনা আক্তার ও নুরুননাহার আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমাদের ছয় বোনের পর এই ভাই। আপনারা আমার ভাইকে এনে দেন, আমরা কোনো রাজনীতি করি না। আমাদের সংসার এখন কে চালাবে, আমাদের কী হবে। এই ভাই রোজগার করে বোনদের বিয়ে দিয়েছে।
নিহত ফয়সালের বাবা বৃদ্ধ মো. সফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, আমার ছয় মেয়ের পর ফয়সালের জন্ম। ফয়সাল লেখাপড়ার পাশাপাশি বাসে পার্টটাইম সুপাইভাইজারের কাজ করে সংসার চালাত। এখন আমার পুরো সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি আমার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার চাই। কারা আমার ছেলেকে হত্যা করল? কী দোষ ছিল আমার ছেলের, সে তো কোনো রাজনীতি করত না। পেটের দায়ে বাসে কাজ করত, তাকে কেন গুলি করে মারা হলো? এই বিচার আমি কার কাছে দেব?
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নিগার সুলতানা বলেন, ১৩ দিন পর ফয়সালের মৃত্যুর খবরটি জানতে পেরেছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। এর আগেও ঢাকায় নিহত কয়েকজনের বাড়িতে আমি গিয়েছি, সহযোগিতা করেছি। ফয়সালের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে, সরকারিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।
মন্তব্য করুন