রেজওয়ান রনি, রংপুর
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৫, ০৩:২৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

আবু সাঈদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছিল ‘বিচার রাজপথেই হবে’

আবু সাঈদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েছিল ‘বিচার রাজপথেই হবে’

১৬ জুলাই ২০২৪ সালের দুপুর বেলা। কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে উত্তাল বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) এলাকা। আন্দোলন দমাতে ক্যাম্পাস গেটের সামনে আন্দোলনকারীদের উপর শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ। পরপর সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল আর মুহুর্মুহু গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের আকাশে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বন্দুকের নলের সামনে দুহাত উঁচিয়ে বুক পেতে দেন আবু সাঈদ। পুলিশের বুলেটবিদ্ধ হয় আবু সাঈদের বুক। লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর হাসপাতালের ট্রলিতে পড়ে থাকা আবু সাঈদের নিথর দেহের পাশে বন্ধু, সহপাঠী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শোকের জল মুছে ফেলেন। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে তারা প্রতিজ্ঞা করেন, ‘বিচার রাজপথেই হবে, এর বিচার ছাত্ররাই করবে।’

এই ঘোষণার পর তারা ট্রলিতে করে আবু সাঈদের মরদেহ নিয়ে মিছিল শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা দেন। মিছিলটি পুলিশ লাইন্স মোড় পর্যন্ত গেলে হঠাৎ করে পুলিশ এসে তাদের কাছ থেকে মরদেহটি ছিনিয়ে নেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বসে পড়ে। কেউ কেউ শুয়ে পড়ে প্রতিবাদ জানায়।

শহীদ আবু সাঈদের লাশ ঘিরে যখন বিক্ষোভের মিছিল তৈরি হচ্ছিল, তখন সেই মিছিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলেন তার বন্ধু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসুল ফারিদ। চোখ ভেজা স্মৃতিতে তিনি জানান সেই বিভীষিকাময় সময়ের কথা।

রাইসুল জানান, ঘটনার দিন পুলিশের গুলিতে তার বন্ধু তুহিন আহত হলে তাকে নিয়ে প্রথমে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তারা। তুহিনকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর কিছুক্ষণ পরই তাদের কাছে খবর এলো আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ সময় তারা দৌড়ে ছুটে যান আবু সাঈদের কাছে।

তিনি বলেন, সেখানে থাকা চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করি- সে কেমন আছে। কিন্তু তিনি কিছু না জানিয়ে বললেন, ‘সিনিয়র ডাক্তার এসে আপনাদের সব জানাবেন।’ পরে সিনিয়র চিকিৎসক এসে এককথায় বলেন, ‘আবু সাঈদ আর নেই।’ সেই মুহূর্তটা তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল বলেন রাইসুল।

রাইসুল বলেন, সে মুহূর্তে হাসপাতালে তখন সর্বসাকুল্যে ১৫-২০ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তারা সিদ্ধান্ত নেন- আবু সাঈদের লাশ ক্যাম্পাসে মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হবে। তাদের কেউ কেউ অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল- ‘ট্রলিতেই লাশ যাবে, রাজপথ দেখেই যাবে সাঈদ।’

আবু সাঈদের লাশ তখন নেওয়া হয় হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে। লাশ নিয়ে আসতে চাইলে তখন শুরু হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গড়িমসি। লাশ হস্তান্তরের আগে নানা ‘প্রক্রিয়া’ দেখিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে তারা। শিক্ষার্থীরা চাপ বাড়াতে থাকলে একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক সেখানে হাজির হন। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাদের উপর ক্ষুব্ধ হন। তখন তারা দুই শিক্ষককে সেখানে রেখে লাশ নিয়ে ক্যাম্পাসে আসার কথা জানান।

এ সময় রাইসুল ফারিদ আবু সাঈদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে জোরালো ঘোষণা দেন- ‘আমরা দেশের প্রশাসন, আইন বা বিচার বিভাগের ওপর আর কোনো ভরসা রাখি না। এর বিচার রাজপথেই হবে, ছাত্ররাই এর বিচার করবে।’

এরপর হাসপাতালের ট্রলিতে করে লাশ নিয়ে বের হয় মিছিল। স্লোগানে কাঁপে রংপুর শহরের রাস্তা- ‘ছাত্রের বুকে গুলি কেন? প্রশাসন জবাব দাও!’, ‘আমার ভাই মরলো কেন? প্রশাসন জবাব দাও!’

রাইসুল বলেন, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়ে এসে কয়েকজন পুলিশ মিছিলে বাধা দেয়। শিক্ষার্থীরা বাধা উপেক্ষা করে লাশ নিয়ে এগোতে থাকলে পুলিশ লাইন মোড়ে তাদের ঘিরে ফেলে পুলিশের অন্তত ৪০ সদস্যের একটি দল। লাশ নিতে যেতে চাইলে সেখানে পুলিশের সঙ্গে শুরু হয় তর্কাতর্কি, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে বলপ্রয়োগ করে তাদের কাছে থেকে আবু সাঈদের লাশ ছিনিয়ে নেয় পুলিশ।

‘পুলিশের এমন জঘন্য আচরণের প্রতিবাদে মিছিলকারীরা তখন রাস্তায় শুয়ে পড়েছিলাম। কেউ আর পিছু হটেনি। কারণ আমরা সেই মুহূর্তেই শপথ নিয়েছিলাম- এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আমরা রাজপথেই করব।’

রাইসুল ফারিদ কালবেলাকে বলেন, আবু সাঈদকে হত্যার পরই আমরা সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ হত্যাকাণ্ডের বিচার রাজপথে হবে। যে সরকারের নির্দেশে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করা হলো তার বিচার রাজপথে হবে। হত্যাকারীদের বিচার এ দেশের ছাত্ররাই করবে।

আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রোড ডিভাইডার পার হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সময় তাকে ধরেছিলেন আরসিসিআই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আয়ান আহসান। পরে আরও কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী এসে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। আহত আবু সাঈদকে প্রথমে ব্যাটারিচালিত রিকশায়, এরপর ব্যাটারিচালিত অটোতে করে হাসপাতালে নিয়ে যান সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) রংপুর জেলার আহ্বায়ক সাজু বাসফোর, মাহীগঞ্জ কলেজের শিক্ষার্থী নিপুন রায় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষার্থী।

সাজু বাসফোর জানান, হাসপাতালে নেওয়ার জন্য প্রথমে আবু সাঈদকে রিকশায় তোলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিএডিসি কার্যালয়ের সামনে গেলে তাকে আর রিকশায় রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে তাকে অটোযোগে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

তিনি জানান, রাস্তাতে আবু সাঈদের শরীর নিথর হয়ে যায়। তার নাক, মুখে তখন রক্ত জমাটবাঁধা ছিল। দুই হাতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ ছিল। রংপুর মেডিকেলে পৌঁছে তাকে জরুরি বিভাগ নেওয়া হলে সেখান থেকে সার্জারি বিভাগে পাঠানো হয়। সার্জারি বিভাগে ইসিজি করা চিকিৎসক কিছু জানাচ্ছিলেন না। তিনি শুধু পরিচালকের কথা বলছিলেন। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সাঈদের লাশ ট্রলিতে করে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দিকে আসার সময় পুলিশ লাশ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এর প্রতিবাদে তারা কাচারী বাজার এলাকায় অবস্থান নেন।

এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা গেছে কি না এমন প্রশ্ন করা হলে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. মজিদ আলী বলেন, ‘এই বিষয়ে মামলা কয়েকটি হয়েছে। এটা আমার ইউনিটে তদন্তাধীন নয়। আবু সাঈদের মামলাটি তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। অন্যান্য অভিযোগগুলো পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করছে। তাদের তদন্তের বিষয়ে আমি কমেন্ট (মন্তব্য) করলে ওটা প্রাসঙ্গিক হয় না।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আবারও রিয়ালের সভাপতি পেরেজ, কোচ হয়ে ফিরছেন মরিনহো

আদ্-দ্বীনের ঘটনায় কোনো ছাড় দেবে না সরকার : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

২০ জুলাইয়ের মধ্যে এসএসসির ফল : শিক্ষামন্ত্রী

‘ঘুষ’ গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল, বাগমারার সেই পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যাহার

বিশ্বকাপ শুরুর ৩ দিন আগে ইংল্যান্ডের বেস ক্যাম্পের কাছে গোলাগুলি

চিফ হুইপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তার সাক্ষাৎ

আবারও নিখোঁজ অভিনেত্রী হিমির নানা

ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল ইরান

কোন জেলায় কবে মিলবে এইচএসসির প্রবেশপত্র, জানাল শিক্ষা বোর্ড

২০২৭ সালের হজের রোডম্যাপ প্রকাশ

১০

পুশ-ইন আতঙ্কে ডিমলার সীমান্তে মাইকিং, পাহারায় বিজিবি-এলাকাবাসী

১১

তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের

১২

কবর খুঁড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল ২ জনের

১৩

ইসরায়েলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের

১৪

ভাইরাল অডিওর জেরে পদ হারালেন বিএনপি নেত্রী

১৫

শেষ মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে দলে ৩ পরিবর্তন

১৬

উত্তেজনা চরমে, ইসরায়েল-ইরানে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে

১৭

চরমোনাই পীর / বাজেটের অর্থ বাস্তবায়নে অপচয় করার অধিকার জনগণ কাউকে দেয়নি

১৮

গ্রাহকদের জন্য জরুরি বার্তা / প্রিপেইড মিটার রিচার্জের পর আসছে ২২০ ডিজিটের টোকেন?

১৯

সুন্দরবনে মালবাহী জাহাজে বনদস্যুদের হামলা, লুটপাট ও গুলি

২০
X