

পেটের পরজীবী বলতে এমন কৃমি ও এককোষী জীবকে বোঝায়, যারা মানুষের শরীরের ভেতরে, বিশেষ করে পেটে বাস করে, বড় হয় এবং বংশবিস্তার করে। এরা সাধারণত মানুষের অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করে।
দূষিত পানি, খাবার বা মাটির মাধ্যমে এসব পরজীবীর অতি ক্ষুদ্র ডিম মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে। একবার শরীরে প্রবেশ করলে এরা নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ সংক্রমণই ভালো হয়ে যায়।
পরজীবী হলো এমন জীব, যারা অন্য জীবের শরীরকে আশ্রয় ও খাবারের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষের শরীর ব্যবহার করে তারা বেঁচে থাকে এবং অন্য মানুষের শরীরে ছড়ানোর সুযোগ পায়। এর বিনিময়ে মানুষের শরীর কোনো উপকার পায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পেটের পরজীবী প্রধানত দুই ধরনের। একটি হলো কৃমি এবং অন্যটি হলো এককোষী জীব, যাদের প্রোটোজোয়া বলা হয়।
কৃমির মধ্যে গোল কৃমি ও চ্যাপ্টা কৃমি রয়েছে। এরা মানুষের শরীরের ভেতরে বড় হলেও সাধারণত শরীরের ভেতরে বংশবিস্তার করতে পারে না। এরা ডিম পাড়ে, যা মলের সঙ্গে শরীরের বাইরে চলে যায়। পরে অন্য কেউ ওই ডিমের সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হয়।
পেটের কৃমির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
পিনওয়ার্ম বা সুতা কৃমি। এই কৃমি ছড়ায় দূষিত জায়গা স্পর্শ করার পর হাত না ধুয়ে মুখে দিলে। রাতে স্ত্রী কৃমি পায়ুপথের আশপাশে ডিম পাড়ে, যার ফলে চুলকানি হয়।
আসকারিস বা গোল কৃমি। এই কৃমি দূষিত মাটির মাধ্যমে ছড়ায়। যেখানে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করা হয় বা মানবমল সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে এর ঝুঁকি বেশি।
হুইপওয়ার্ম। দেখতে চাবুকের মতো হওয়ায় এদের এই নাম। এদের সংক্রমণও দূষিত মাটির মাধ্যমে হয়।
হুকওয়ার্ম। এদের মাথা হুকের মতো, যা দিয়ে পেটের দেয়ালে আটকে থাকে। খালি পায়ে দূষিত মাটির ওপর হাঁটলে এই কৃমি ত্বক দিয়ে শরীরে ঢুকতে পারে।
স্ট্রংগিলয়ডিস। এই কৃমি মুখ দিয়ে বা ত্বক দিয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং মানুষের শরীরের ভেতরেই বংশবিস্তার করতে পারে।
টেপওয়ার্ম। দেখতে ফিতার মতো লম্বা এই কৃমি কাঁচা বা কম রান্না করা গরু, শূকর বা মাছের মাংস থেকে ছড়াতে পারে।
ট্রিকিনেলা। সাধারণত কাঁচা বা ঠিকমতো রান্না না করা মাংস খেলে এই কৃমির সংক্রমণ হয়।
ফ্লুক। দূষিত পানি পান করা বা আক্রান্ত জলজ উদ্ভিদ ও মাছ খেলে এই সংক্রমণ হতে পারে।
প্রোটোজোয়া সাধারণত দূষিত পানি, ফল বা সবজির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এরা মানুষের শরীরের ভেতরেই বংশবিস্তার করতে পারে।
সব ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা নাও দিতে পারে। তবে লক্ষণ দেখা দিলে তা পরজীবীর ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো
-ডায়রিয়া
-পেটে ব্যথা
-গ্যাস ও পেট ফাঁপা
-বমি ভাব বা বমি
-পায়ুপথে চুলকানি
অনেক সময় মলের সঙ্গে কৃমি দেখা যায় না। সাধারণত ডিম এত ছোট হয় যে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। তবে টেপওয়ার্মের কিছু অংশ মাঝে মাঝে মলের সঙ্গে বের হতে পারে, যা সাদা চালের দানার মতো দেখায়।
পেটের পরজীবী সাধারণত মলের মাধ্যমে ছড়ানো ডিম শরীরে ঢোকার ফলে হয়। এগুলো এত ক্ষুদ্র যে মানুষ বুঝতেই পারে না।
-দূষিত পানি পান করা
-দূষিত খাবার খাওয়া
-হাত না ধুয়ে মুখে হাত দেওয়া
-খালি পায়ে দূষিত মাটিতে হাঁটা
-উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া
-বিশুদ্ধ পানির অভাব
-অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
-অনেক মানুষ একসঙ্গে বসবাস করা
-গবাদিপশুর কাছাকাছি থাকা
চিকিৎসা না নিলে পেটের পরজীবী থেকে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে। যেমন-
-পানিশূন্যতা
-পুষ্টিহীনতা
-রক্তস্বল্পতা
-পেটের ভেতরে বাধা সৃষ্টি
-বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি
সাধারণত মল পরীক্ষা করে পেটের পরজীবী শনাক্ত করা হয়। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যান করা হতে পারে।
চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরজীবীনাশক ওষুধ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুই ডোজেই রোগ সেরে যায়। তবে কিছু সংক্রমণে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ওষুধ খেতে হয়।
প্রতিরোধের উপায়
-বিশুদ্ধ পানি পান করা
-নিয়মিত হাত ধোয়া
-ভালোভাবে রান্না করা খাবার খাওয়া
-খালি পায়ে মাটিতে না হাঁটা
-শাকসবজি ও ফল ভালোভাবে পরিষ্কার করা
পেটের পরজীবী একটি পরিচিত কিন্তু অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপরিষ্কার পানি ও খাবারের কারণে এই সংক্রমণ সহজেই ছড়াতে পারে। সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে পেটের পরজীবী সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সূত্র : Clivland Clinic
মন্তব্য করুন