বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ বিচারপতি সৈয়দ আসিফ শাহকার। এর আগে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননাপ্রাপ্ত বিচারপতি আসিফ শাহকার মৃত্যুর পর বাংলাদেশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি লেখেন।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে আজ বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সৈয়দ আসিফ শাহকারকে নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করা হয়। খবর বাসসের।
চিঠিতে বলা হয়, ‘যেহেতু আসিফ শাহকার সৈয়দ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করিয়াছেন এবং অনুরূপ নাগরিকত্বের সনদ প্রদানের ব্যাপারে তিনি সরকারকে সন্তুষ্ট করিয়াছেন। সেহেতু, এক্ষণে বাংলাদেশ সিটিজেনশিপ (টেম্পোরারি প্রভিশন্স) অর্ডার, ১৯৭২ (পি.ও. নং ১৪৯ অব ১৯৭২)-এর আর্টিকেল ৪ এবং উক্ত অর্ডার এর অধীনে প্রণীত বিধিমালায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার এতদ্বারা আসিফ শাহকার সৈয়দকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করিলেন এবং ঘোষণা করিলেন যে, উক্ত অর্ডার এর বিধানাবলী সাপেক্ষে, তিনি বাংলাদেশের একজন নাগরিক বলিয়া গণ্য হইবেন এবং বাংলাদেশের একজন নাগরিক যে সকল অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও যোগ্যতার অধিকারী তিনিও সেই সকল অধিকার সুযোগ-সুবিধা ও যোগ্যতার অধিকারী হইবেন এবং বাংলাদেশের যে কোনো কিংবা সকল আইন অনুসারে বাংলাদেশের একজন নাগরিকের যে সকল দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায় থাকিবে তাঁহারও সেই সকল দায়িত্ব, কর্তব্য ও দায় থাকিবে।’
সৈয়দ আসিফ বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আজ আমার নতুন জন্ম হলো। ১৯৭১ সাল থেকে যে দেশ এবং দেশের মানুষকে আমি ভালোবাসি, সেই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি আজ পুনর্জন্ম লাভ করলাম। আমি আজ সবচেয়ে আনন্দিত এজন্য যে, বাংলাদেশের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে আমি শেষ নিদ্রায় শায়িত হতে পারব।
তিনি জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘মহান নেতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি সালাম জানাই। আমি মনে করি, বিশ্বের হাজার হাজার বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এই পৃথিবীকে স্বর্গ করতে পারে। পাকিস্তানের যদি বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা থাকত তাহলে তা বিশ্বের একটি দৃষ্টান্ত হতো। আমি মানবতার জননী শেখ হাসিনাকে সালাম জানাই, যিনি আমার স্বপ্নকে সত্য করেছেন। আমি তাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব। আমি যেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশের সেবা করতে পারি।’
সৈয়দ আসিফ শাহকার ১৯৪৮ সালের ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানের পাঞ্জাবের হরোপ্পায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি তরুণ। পাঞ্জাব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলেন। ২৫ মার্চের কালরাত্রে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের নির্মম ও নৃশংস জেনোসাইডের প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের একটি অংশ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। তাদের সাথে প্রতিবাদ, সমাবেশ, কবিতা লেখা ও লিফলেট বিতরণ করেন এই তরুণ। আর তার পরিণামে তিনি নিজ পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে ওঠেন। তাকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তিনি পাকিস্তানের কারাগারে নানারকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের বিপক্ষে যাননি। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ এ বাংলাদেশের বিজয়ের পর সৈয়দ আসিফ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান।
জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি কিছুদিন লাহোরে পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু নিজ দেশে ‘কুলাঙ্গার’ হিসেবে স্থায়ী পরিচিতি নিয়ে তিনি বেশিদিন পাকিস্তানে থাকতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে তিনি সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে যান। নতুন এক জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখানেই তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান এবং কাজ শুরু করেন।
স্বাধীনতার ৪১ বছর পর ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে বিচারপতি আসিফ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশে আসেন। রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর তার হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এরপরই ২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লেখেন। কিন্তু সে চিঠির কোনো উত্তর তিনি পাননি।
মন্তব্য করুন