রাশেদ খান মেনন
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৩, ১১:৫১ এএম
আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৩, ০৬:০৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
সাক্ষাৎকারে রাশেদ খান মেনন

রাষ্ট্রক্ষমতা কিছু ধনিক গোষ্ঠী ও আমলার হাতে বন্দী

রাশেদ খান মেনন। ছবি : সংগৃহীত
রাশেদ খান মেনন। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির নির্বাচিত সভাপতি। বর্তমানে জাতীয় সংসদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের জন্য গঠিত সর্বদলীয় মন্ত্রিসভায় ডাক ও তার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত নির্বাচনে তিনি ঢাকা থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৮ সালের পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ছিলেন। তিনি ছিলেনবাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আইনবিরোধী ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ১৯৬৩-৬৪ সালে তিনি ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হন। কনভোকেশন বয়কটের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। সুপ্রিমকোর্ট থেকে এ বহিষ্কারাদেশ বাতিল ঘোষণা হলে জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে এমএ পাশ করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠনে তিনি অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ২০০৮-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

কালবেলা : বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫১ বছর পেরিয়েছে। আমাদের অনেকগুলো লক্ষ্য ছিল। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য ছিল, গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার একটি লক্ষ্য ছিল। রাজনীতির লক্ষ্যটা আমরা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি?

রাশেদ খান মেনন : তৎকালীন রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। সেটা আমরা অর্জন করেছি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এই তিনটার কোনো লক্ষ্যই আজ পর্যন্ত অর্জিত হয়নি। যদিও বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে এই বিষয়গুলোর ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রদত্ত বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর 1971 সালের ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে যতটা কথা বলে 1972 সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণ সেভাবে সামনে আনে না।

বাংলাদেশ হবে একটি আদর্শ রাষ্ট্র যেখানে ধর্মের কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না, সর্বোপরি যেটি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ- এটি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। জাতীয়বাদ কথাটা তখনো আসেনি। পরবর্তীকালে সংবিধানে জাতীয়তাবাদ সংযোজন করা হয়েছে । এই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বাংলাদেশ একটি বড় সময় সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। এই সামরিক শাসন আমাদের অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে বলেছিলেন, ‘বাস্কেট কেস’। সে পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিল সামরিক শাসকরা।

গত দেড় থেকে দুই দশকে আমরা সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে এসেছি। আজ আমরা উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এগিয়েছি, আমাদের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, দারিদ্র্য কমে এসেছে। কিন্তু বৈষম্য এতটাই প্রবল যে, আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের লক্ষ্য অধরাই রয়ে গেছে।

দ্বিতীয় দিক হলো মানবিক মর্যাদাবোধ। এক্ষেত্রে ধারণাটি হলো সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের মধ্যে নিয়ে আসা। কিন্তু সেটিও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। পরমত অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়ে গেছে। ফলে মানুষে মানুষে পার্থক্য ও লিঙ্গ ভেদ বেড়ে গেছে। যদিও আমরা লিঙ্গ সমতার কথা বলি। বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে অনেকখানি তবুও লিঙ্গ সমতা আসেনি বরং নারী-পুরুষের বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মজুরি বৈষম্য আছেই। নারী হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়েও আজ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে নানাভাবে। তাদের মৌলিক অধিকার এবং মানবাধিকারের লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি।

সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়টি আমাদের সামনে সাম্যের ধারণা থেকে এসেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বয়স্ক ভাতা দিয়ে শুরু করেছেন। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় সব মানুষকে আনার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষ, বয়স্ক মানুষদের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হয়েছে, বিভিন্ন ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অনেক কম। যে লক্ষ্য নিয়ে আমরা বাংলাদেশের পথে যাত্রা করেছিলাম তা অর্জিত হয়নি, যদিও আমরা উন্নয়নের পথে রয়েছি।

কালবেলা : প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এই জায়গা থেকে উত্তরণ ঘটছে না কেন?

রাশেদ খান মেনন : ১৯৭৫ সাল পরবর্তী নির্বাচন ব্যবস্থাটাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্যে পেশিশক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন চলে আসে। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তবুও এটাকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। আমরা যতটুকু পেরেছিলাম বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা উল্টে দিয়েছিল। ফলে নির্বাচন সম্পর্কিত প্রশ্ন বারবার ঘুরে-ফিরে আমাদের সামনে হাজির হয় ।

কালবেলা : অনেকে অভিযোগ করেন, আমাদের রাজনৈতিক বলয়টি জনগণ নয়, ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। যে কারণে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে। এটি কতটা সত্য?

রাশেদ খান মেনন : সব রাজনীতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রশ্ন কেন্দ্রে থাকে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কার ওপর নির্ভর করে এটা হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি কি প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা প্রয়োগ করব নাকি জনগণের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা প্রয়োগ করব সেটাই হলো মূল বিষয়।

কালবেলা : আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

রাশেদ খান মেনন : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বৈদেশিক প্রভাব খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার কখনো মনে হয়নি। এটা সত্য, পাশের দেশ ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব খাটাতে চেষ্টা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর খুব একটা ক্ষমতা নেই। বর্তমানে তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

কালবেলা : বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপকে কীভাবে দেখছেন?

রাশেদ খান মেনন : এটাকে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি না। রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রভাব তৈরি করতে পারবে বলেও আমি মনে করি না। হয়তো সেই রাষ্ট্রদূতরা বা রাষ্ট্র দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, নির্বাচনকে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। এর বাইরে কিছু হবে বলে আমি মনে করি না। এই মুহূর্তে তারা খুব বড় ধরনের প্রভাব খাটাতে পারবেন না।

কালবেলা : সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পথটা কি?

রাশেদ খান মেনন : আমাদের গণতন্ত্রের সামনে যে বাধাগুলো আছে তা দূর করা। গণতান্ত্রিক চর্চা আরও বাড়ানো দরকার। সঠিক পন্থার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে যেতে হবে। আমাদের দরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

কালবেলা : রাজনীতিতে একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে যারা অর্থবিত্তে অনেক শক্তিশালী। যে কারণে অনেক সময় ভালো রাজনীতিবিদ বা জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা ব্যক্তি সামনে আসতে পারছে না বলে বলছেন অনেকে। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

রাশেদ খান মেনন : এটাকে বদলানো যায় না বলে আমি মনে করি না। তবে এক্ষেত্রে আমি শুধু তাদেরই দোষ দেব না। আমাদের নতুন প্রজন্ম এগুলো দেখেই বড় হয়েছে, ফলে তাদের মাথার মধ্যে মূলত এটাই কাজ করে। ফলে তাদের আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে এটাই প্রধান হিসেবে আসে। এই ব্যবস্থাটা পাল্টানোর জন্য নতুন প্রজন্মকে দায়িত্ব নিতে হবে ।

আমরা যখন ষাটের দশকে রাজনীতির পথে যাত্রা করেছিলাম তখন এর থেকেও অন্ধকার সময় ছিল। আমরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই লড়াই করেছি। এখনকার প্রজন্ম সেই লড়াইয়ের দিকে যাচ্ছে না। তারা ভোগবাদী জীবনের দিকে চলে যাচ্ছে অথবা ক্যারিয়ারতান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তারা মাদকাসক্ত বা সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এখান থেকে অন্তত একগুচ্ছ তরুণকে বেরিয়ে আসতে হবে, যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করবে। যেটা আমরা করেছিলাম ষাটের দশকে।

কালবেলা : বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে আপনার কি মনে হয় নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে? সংঘাত কি অনিবার্য হয়ে উঠছে?

রাশেদ খান মেনন : অবশ্যই নির্বাচন হবে। হয়তো এই সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সংঘাত হবে, তবে নির্বাচন হবে।

এক্ষেত্রে সংঘাত এড়ানোর পথ হবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে সংঘাত এড়ানোর পথ তৈরি হবে। আবার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনেও সংঘাত হতে পারে। কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সেটা সীমিত হয়ে যায় যদি সবাই অংশগ্রহণ করে।

কালবেলা : বিএনপি বলছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না…

রাশেদ খান মেনন : বিএনপি বারবার এ কথাই বলছে। কিন্তু তারা নিজেরাই তো এটা অনুসরণ করেনি। অতীতে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত করেছে। নিজেরাই যে আচরণ করেনি এখন অন্যকে বললে তারা তা আমলে নিবে না।

কালবেলা : সরকার বলছে, তারা কোনো ধরনের আলোচনায় যাবে না?

রাশেদ খান মেনন : আলোচনার খুব একটা কিছু নেই। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে, একজন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী কখনো কি সেটা মানবেন? কোনো দেশেই কি মেনেছে? আপনি ইংল্যান্ডে গিয়ে যদি বলেন ঋষি সুনাক পদত্যাগ করতে হবে তাহলে আমি নির্বাচনে আসব। তিনি কি সেটি মানবেন? জো-বাইডেনকে যদি বলেন আপনাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি কি সেটা মানবেন? বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ও প্রধানমন্ত্রী কেন মানবেন?

কালবেলা : অনেকে বলছেন অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে রাজনীতি একটা বড় ভূমিকা রাখছে। অর্থ পাচারের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক আছে কি?

রাশেদ খান মেনন : অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন পরস্পর সম্পর্কিত। অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তখনই সম্ভব যখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটে। আবার রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটে। এই দুটো পারস্পরিক সম্পর্কিত।

আজকে অর্থ পাচার কখনোই হতে পারত না যদি নীতি হিসেবে ব্যবস্থাগুলো আমরা নিতে পারতাম। ঋণখেলাপিদের জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে সেখানে অর্থ পাচার হবেই। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

কালবেলা : অর্থ পাচার কী টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়?

রাশেদ খান মেনন : উন্নয়ন টেকসই হচ্ছে কিনা ঠিক বলা যাচ্ছে না। যদি টেকসই হতো তাহলে বাংলাদেশে এভাবে ডলার সংকট তৈরি হতো না। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিত না, রিজার্ভে সংকট দেখা দিত না। যদি টেকসই হতো তাহলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট দেখা দিত না।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে বলে অর্থনীতি তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, বিষয়টা এ রকম না। আমরা উন্নয়নশীল দেশের দিকে যাচ্ছি অথচ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে মাত্র ৫ শতাংশ, এটা হয় না। আমাদের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হওয়া দরকার। প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গেলে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করলেই প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুশাসন হলেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে। উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারব আমরা। বৈষম্য দূর করতে হবে। বৈষম্য দূর করলে জনগণের কাছে উন্নয়ন অর্থবহ হবে।

কালবেলা : যারা বৈষম্য দূর করতে পারেন তারা কি যথেষ্ট তৎপর?

রাশেদ খান মেনন : রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীয়ভূত হয়ে গেছে মুষ্টিমেয় ধনিক গোষ্ঠী, আমলাদের কাছে। এখান থেকে ক্ষমতাকে বের করে জনগণের কাছে নিয়ে আসতে হবে। তার জন্য একটা বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে আইনের পরিবর্তন করে খুব একটা কিছু হবে না। মানুষের মধ্যে স্বচ্ছ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মূল বিষয়, মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লড়াইয়ে কোনো গণঅভ্যুত্থান হবে না। গণঅভ্যুত্থান হবে জনগণের প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এলে।

কালবেলা : বামপন্থি সংগঠনগুলো একসময় অনেক আন্দোলনে যুক্ত ছিল। এখন কেন জনগণের দাবি আদায়ে তাদের আন্দোলনে দেখা যায় না?

রাশেদ খান মেনন : এখন থেকে না, বহুদিন থেকে এটা দেখা যাচ্ছে না। পাকিস্তান আমল থেকেই বামপন্থিদের শক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে। তার পরও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত একটা বড় ভূমিকা তারা পালন করতে পেরেছে। কিন্তু নব্বই পরবর্তীকালে তারা আর সেটা পারেনি।

আমরা ১০ বছর আন্দোলন করে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সফল করেছিলাম। সম্ভব হয়েছিল সেটা। তেমনি বর্তমান সময়ের দাবি আদায়ে লম্বা সময় লাগবে। ধৈর্য ধরতে হবে। একদল মানুষকে তাদের জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করতে হবে। রাজনীতিতে জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। তাত্ত্বিক কথা বা আলোচনা দিয়ে আন্দোলন সম্ভব নয়। মানুষ কান পেতে আছে শোনার জন্য কিন্তু মানুষকে সে কথা বলতে পারতে হবে। তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

কালবেলা : আগামী নির্বাচনে বামপন্থীরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কি?

রাশেদ খান মেনন : পারবে, কিন্তু খুব বেশি পারবে না বলে আমি মনে করি না। বামপন্থিদের সাংগঠনিক শক্তি ও উদ্যোগে মানুষ কিছুটা হতাশ হয়ে গেছে। দশজন লোক দিয়ে মানববন্ধন করে কিছু হবে না। বঞ্চিত মানুষদের রাস্তায় নামিয়ে আনতে হবে। আপনি খেয়াল করবেন, বিএনপির মিছিলে লোক হচ্ছে কিন্তু তাদের প্রতি মানুষের আস্থাবোধ তৈরি হচ্ছে না। বামপন্থিদের সেই আস্থাবোধ তৈরি করতে হবে।

কালবেলা : বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতি আপনার আহ্বান কি থাকবে?

রাশেদ খান মেনন : বিএনপির প্রতি একটাই পরামর্শ তা হলো, তারা নির্বাচনে আসুক। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্লোগান দিলে হবে না। তারা নিজেরাই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেনি। নিজেরা যেটা করেনি সেটা অন্যদের উপরে চাপিয়ে দিলে তারা মানবে কেন? আর আওয়ামী লীগের প্রতি আমার একটাই আহ্বান যে, কাউকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করে নির্বাচন জেতা যাবে কিন্তু সেটি টেকসই হয় না। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই পর্যন্তই থাকবেন। কিন্তু তারপরে? তারপরে কি হবে?

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বুধবার ঢাকায় জোহরের নামাজের ইমামতি করবেন আল্লামা পীর সাবির শাহ্

‘নির্বাচন নিয়ে কেউ বিকল্প ভাবলে তা হবে বিপজ্জনক’

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন নিয়ে ফখরুলের বার্তা

মেক্সিকোয় নিখোঁজ ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ, কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে?

হঠাৎ বিমানের দরজা খুলে দিল যাত্রী, অতঃপর...

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের অভিযোগ

সরকারকে আমরা ব্যর্থ হতে দেব না : রাশেদ খাঁন

নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি জটিল করা হচ্ছে : তারেক রহমান

রাবি শিবির সভাপতির বুকে বোতল নিক্ষেপ

দেশের জনগণ এখন নির্বাচনমুখী হয়ে গেছে : দুলু

১০

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিএনপির বিকল্প নেই : এমএ আজিজ

১১

প্রিমিয়ার লিগে ম্যানসিটির টানা দ্বিতীয় পরাজয়

১২

স্পেন থেকে ১০০ জাহাজের বহর যাচ্ছে গাজায়

১৩

চবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

১৪

‘আমি সেই ভাগ্যবান, যে বাবা-মায়ের কাছে থাকতে পারি’

১৫

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ

১৬

বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার অলির মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব নিলেন তারেক রহমান

১৭

বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে ৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি

১৮

৩ মাসের জন্য এনসিপির ‘নির্বাহী কাউন্সিল’ গঠন

১৯

বৈশ্বিক তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর ৬৮তম

২০
X