ইমরান খানকে রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিতে কোনো প্রচেষ্টাই বাকি রাখেনি নওয়াজ শরিফ-বিলাওয়াল ভুট্টো গং এবং এর পক্ষে কাজ করা পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনা জেনারেলরা। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ইমরান খান দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি হারিয়ে যাওয়ার পাত্র নন। নির্বাচন-পূর্ববর্তী বড় একটি সময় গণমাধ্যমের সামনে আসতে পারেননি তিনি। জনসাধারণের দৃষ্টি থেকে দূরে রাখার সমস্ত চেষ্টাই করা হয়েছে। এমনকি পিটিআইকে দলীয়ভাবে অংশগ্রহণও করতে দেওয়া হয়নি নির্বাচনে।
টানা ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন ইমরান খান। ২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে এক অনাস্থা প্রস্তাবে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন ইমরান খান। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তার নামে বিভিন্ন মামলা করা হয়। দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ইতোমধ্যে তিন বছরের কারাদণ্ডও ভোগ করছেন তিনি। দেশের গোপন তথ্য পাচার করার অভিযোগ এনে নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই ইমরান খানের আরও ১০ বছরের জেল দেন দেশটির আদালত। অভিযোগ ওঠে, ইমরান খানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি অধিকার না দিয়েই তাড়াহুড়ো করে তার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে দেওয়া হয়।
নির্বাচনের আগে অনেক পিটিআই প্রার্থীকে অপহরণ করা হয়েছে, অনেককে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ১৩ কোটি পাকিস্তানি ভোটারের কাছে নির্বাচনী প্রতীকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পড়তে জানে না, তারা ব্যালট পেপারে প্রতীক দেখে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। ইমরান খানের দলের আইকনিক প্রতীক হলো ক্রিকেট ব্যাট, যে প্রতীকের মাধ্যমে মানুষ ইমরান খানকে এবং পিটিআইকে বুঝে। নির্বাচনে সেই আইকনিক ব্যাট প্রতীকটিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ফলে দলের প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল আলাদা আলাদা প্রতীক এবং তাদের নির্বাচনী প্রচার চালাতে সব ধরনের বাধা দেওয়া হয়েছে।
তবে এতকিছু করেও আটকানো যায়নি পিটিআই চেয়ারম্যানকে। নির্বাচনে জেলে বসে প্রচার চালিয়েছেন তিনি। দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। তারা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) ব্যবহার করে খানের বক্তব্য পৌঁছে দিয়েছেন জনগণের কাছে। সবধরনের বাধা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতেছে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
সব ভয়-ভীতি কাটিয়ে নির্বাচনের দিন বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন। পিটিআই সমর্থকদের পক্ষে যুদ্ধটি উল্টে দেওয়ার এটাই ছিল একমাত্র উপায় এবং তারা সেটা করে দেখিয়েছে। ২৬৫টি আসনের মধ্যে ১০৪টি আসনে জয় পেয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নওয়াজ শরিফের পিএমএমএল-এন পেয়েছে ৭৪টি আসন এবং বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পিপিপি পেয়েছে ৫৪টি আসন। অনেক কেন্দ্রে ফল প্রকাশে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেছে নির্বাচন কমিশন। অনেকে অভিযোগ করছেন, ভোট গণণায় ব্যাপক কারচুপি করা হয়েছে, কারচুপি না হলে পিটিআই আরও অনেক বেশি আসন পেত। পিটিআই নির্বাচনে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে, অন্যদিকে নওয়াজ শরিফও নিজেকে বিজয়ী দাবি করেছেন।
তবে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ ফলের পর এখন জোট গঠন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি কোনো রাজনৈতিক দল। ফলে জোটের ওপর নির্ভর করছে সরকার গঠন। কিন্তু দেশটির বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে ‘জোট গঠন’ আসলে কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ আসমা ওয়াদুদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিরোধীদের সাথে জোট গঠন করে তাহলে তারা ভোটারদের থেকে বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হবে।
সিনেটর মুশাইদ হুসেইন সৈয়দ বলেছেন, গত ৫০ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় নির্বাচন। পাকিস্তানের জনগণের ইচ্ছা ও ম্যান্ডেটকে সম্মান করে জাতীয় ঐক্য এবং স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করার জন্য এই নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি ছিল।
আসমা ওয়াদুদ বলেন, এর আগে যখন দলগুলো জোটের জন্য বিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তখনই এটা তাদের রাজনৈতিক আদর্শকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। ভোটাররা রাজনৈতিক দলের আচরণের কারণে হতাশ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ফলে যদি আবারও এটি ঘটে তাদের সমস্যা আরও প্রকট হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মূলধন আরও হারিয়ে ফেলবে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ পাঞ্জাব এবং এটিই ভোটের মাঠে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। এই প্রদেশে সেনাবাহিনী তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এনের পক্ষে স্পষ্টভাবে কাজ করেছে তা প্রমাণিত। নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ, দুর্নীতির অভিযোগে কারাদণ্ড হওয়ার পর থেকে তিনি ব্রিটেনে পলাতক ছিলেন। পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে আজীবন নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। গত নভেম্বরে সেনা সমর্থনে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং তার কারাদণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়। তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসার অনুমতি পান।
নানা অনিয়ম এবং ফল জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে এই নির্বাচনে যদি নওয়াজ শরিফ গং-কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসানো হয় তাহলে সেটা পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটুকু বজায় রাখবে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে। পাকিস্তানের জনগণ এই ফল কীভাবে গ্রহণ করবে সেটা নিয়েও তৈরি হয় সংশয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, বৃহস্পতিবারের নির্বাচন পাকিস্তানকে আরও অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে।
রশীদ হোসাইন সাঈদ : সাংবাদিক ও গবেষক
মন্তব্য করুন