মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে অপেক্ষাকৃত ভয়ংকর শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে। অন্তত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি মিসাইল, রকেট ও ড্রোন হামলার অতি উত্তেজনাকর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, অবশ্যই গাজা তার বাইরে ছিল।
অবশ্যম্ভাবী একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ভয় প্রশমিত হয়েছে। যে কোনো মূল্যে এই মুহূর্তে যুদ্ধ এড়ানোর বিষয়ে দু'পক্ষই সচেষ্ট ছিল। তাদের বিশ্বাস, এর মধ্যদিয়ে কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং নৈতিক জাতীয় শক্তি জোরদারের মধ্যদিয়ে কট্টরপন্থিদের সমালোচনা এড়াতেও সক্ষম হয়েছে তারা। ফলে, ইসরায়েল ও ইরান যে সরাসরি একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না এর মাধ্যমে তা এবার প্রতীয়মান হয়েছে।
নিজেদের বিবাদ মীমাংসা না হওয়া সত্ত্বেও দু-পক্ষই পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এতে দু'দেশেই প্রাণহানি এড়ানো গেছে এবং সন্দেহাতীতভাবেই তা ছিল উদ্দেশ্যমূলক। যদি তারা চাইত, তাহলে উভয় পক্ষেরই এই সংঘাতকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং একে অপরের অঞ্চলে ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটানোর মতো সক্ষমতা ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সংঘাত ও দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে গেছে। গত ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে গাজা থেকে দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো হামলার ফলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই হামলার সূত্র ধরে প্রথমবারের মতো ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হামলা চালায় এবং ইসরায়েলও ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দেয়। দেখা যাচ্ছে, এই দুই শক্তি এখন পরবর্তী অশুভ ধাপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সবার দৃষ্টি এখন লেবাননের প্রতি : ঘড়ির কাঁটা সম্ভবত এখন লেবাননের দিকেই ঘুরছে। আসন্ন দিনগুলোতে সম্ভাব্য ইসরায়েলি আক্রমণ দু-দেশেই ব্যাপক ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করবে, যা বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ নীতিকে ধ্বংসের মুখে ফেলবে। লেবাননে হিযবুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে ইসরায়েল। অ্যামেরিকান প্রশাসন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই বসন্ত কিংবা গ্রীষ্মের শুরুতে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তেল আবিব। ইরান-ইসরায়েল সাম্প্রতিক সরাসরি সামরিক হামলাই হয়তো লেবাননের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। যদি বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে সংযত রাখতে না পারে তাহলে সংঘাত অনিবার্য।
সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সূত্রপাত কীভাবে হলো, সেটা ঘেঁটে দেখা জরুরি। গত ১ এপ্রিল ইসরায়েল সিরিয়ার দামেস্কের ইরানি দূতাবাসে হামলা চালায়। ওই হামলায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা জাহেদি, তার ডেপুটি জেনারেল হাজি রাহিমি এবং দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা যিনি সিরিয়া ও লেবাননে ইরানের বিশেষ বাহিনী 'কুদস ফোর্সের' চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন আমিরুল্লাহসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। ইজরায়েলের জোর দাবি, এসব সিনিয়র কমান্ডাররা ইরানের সহায়তায় আরব বিশ্বে মিলিশিয়া গ্রুপ ও সশস্ত্র গ্রুপের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতো, যার নেতৃত্বে রয়েছে হিযবুল্লাহ। তারা গাজা ভিত্তিক হামাসকে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সহায়তা দেওয়া ছাড়াও লেবাননে হিযবুল্লাহকে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদে হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করছিল। ইসরায়েলের এই অভিযোগ অনেকটাই সঠিক। নচেৎ তেহরান কেন দামেস্কের দূতাবাসে ওই হামলায় এত বেশি আহতবোধ করল সেটি বেশ লক্ষ্যণীয়।
এদিকে, ৭ অক্টোবরের পর ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল- গাজা থেকে অন্যত্র বিশেষ করে লেবাননে যাতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে না পারে। কিন্তু ভয়ের কারণ হলো, সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তাতে সহজেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানকে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে প্রথম আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যায় কিনা সেখানে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলে অবশ্যই অনেক কট্টরপন্থি রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরেই চাচ্ছে যে, ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে অ্যামেরিকা হামলা করুক। কিন্তু দীর্ঘদিনের সেই আশা পূরণ না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন তারা।
তবে, লেবাননের বিরুদ্ধে হামলার মূল কারণ কেবল সেটিই নয় এবং তেমন নিশ্চয়তা দেওয়াও সম্ভব নয়। বরং এর পরিবর্তে, ৭ অক্টোবরের ঘটনা ইসরায়েলি কট্টরপন্থিদেরকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে নতুন এবং আপসহীন মনোভাব তৈরি করে দিয়েছে। বিশেষ করে সরাসরি ইসরায়েল সীমান্তে থাকা ইরানের অর্থপুষ্ট গ্রুপের ক্ষেত্রে। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার কিছুদিনের মধ্যেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আগাম বড় ধরনের হামলার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করেন। কারণ, লেবাননের এই মিলিশিয়া গ্রুপটি ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী হুমকি। তবে, বাইডেন প্রশাসন এ ধরনের অভিযান স্থগিতের ব্যাপারে অ্যামেরিকার বিরোধীদলকে স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে বড় হুমকি সংগঠনটির প্রায় দেড় লাখ মিসাইল ও রকেট। যার মধ্যে অনেকটি প্রিসিশন গাইডেড, যা ইসরায়েলের যেকোনো স্থানে হামলা চালাতে সক্ষম এবং সম্ভবত আয়রন ডোম ও অন্য মিসাইল বিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ফাঁকি দিতে সক্ষম। যদিও সীমান্তে প্রতিদিনই ইসরায়েলের ছোটখাটো হামলার পাল্টা জবাব দিচ্ছে হিজবুল্লাহ, তথাপি ইরান সমর্থিত গ্রুপটি পরিষ্কার করেই বলেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সীমান্ত যুদ্ধ চায় না। এরই অংশ হিসেবে তারা তাদের এলিট যোদ্ধাদেরকে দক্ষিণ সীমান্ত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইসরায়েলের মূল টার্গেট লেবাননে হিজবুল্লাহর মিসাইল, রকেট এবং ড্রোন অস্ত্র ধ্বংস করা। তেল আবিবের আশা, তারা সেটিতে সক্ষম হবে। এরপর সুযোগ বুঝে সবচেয়ে নিকটবর্তী এই শত্রুর বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রায় হামলা চালানো।
ইসরায়েলি নেতাদের সন্দেহাতীত আশা যে, লেবাননের সঙ্গে সম্ভাব্য আরেকটি যুদ্ধ ইসরায়েলকে বড় ধরনের বিজয় এনে দেবে, যা গাজায় কখনোই সম্ভব হয়নি। হিজবুল্লাহ হামাসের চেয়ে বেশি ‘কনভেনশনাল’ ফোর্স। ফলে সামরিক এবং অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি যদি পরিমাপযোগ্য এবং সহনীয় পর্যায়ে থাকলে হয়তো তা ইসরায়েলিদের কাছে বাহবা পাবে। একইসঙ্গে, দেশটিকে নতুন কোনো আরব ভূমি দখলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো বেগ পেতে হবে না। ইসরায়েলি নেতারা এমন আশা করতে পারেন যে, এর ফলে ইরানের আঞ্চলিক তুরুপের তাসের মারাত্মক অধঃপতন ঘটবে। তবে, যতবারই হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েল সংঘাতে জড়িয়েছে, প্রতিবারই তারা গ্রুপটির সক্ষমতা প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দেখতে পেয়েছে। ফলে, ইসরায়েলিরা চাইলে লেবাননে অনুশোচনার জন্য আরেকটি পরিহারযোগ্য দুঃসাহসিক অভিযানে যেতে পারে।
বাইডেনের জন্য চরম দুঃস্বপ্ন : তবে, বাইডেন প্রশাসনের জন্য এটা হবে চরম দুঃস্বপ্নের। গাজায় ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটন থেকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্র যাতে বন্ধুদের সংযত করার পাশাপাশি শত্রুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারে। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর সম্ভবত প্রশাসন, এমনকি প্রসিডেন্ট জো বাইডেনও ব্যক্তিগতভাবে লেবাননে বড় ধরনের হামলা থেকে ইসরায়েলকে বিরত রাখতে পারেন। আর যদি ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত লেবাননে হামলা করেই বসে, তাহলে গাজা যুদ্ধ নিয়ে অ্যামেরিকার প্রাথমিক- সংঘাত নিয়ন্ত্রণ-প্রচেষ্টা ওয়াশিংটনের শত্রু নয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র দ্বারাই ঝাঁকুনি খাবে।
অনুবাদ : মোহসিন কবির (সিএনএন অবলম্বনে অনূদিত)
মন্তব্য করুন