পাকিস্তানকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে দীর্ঘকাল আগেই বেরিয়ে এসেছে ভারত। গত দশকজুড়ে ভারত মহাসাগরের নীল জলে চীনের দৃঢ় উপস্থিতি বাড়তে শুরু করলে, পশ্চিম থেকে বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলের দিকে তাকিয়ে ছিল ভারত।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরতা থাকায়, একটি স্থিতিশীল সরকার এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
একই ইতিহাস এবং সংস্কৃতির অংশীদার হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবেই সম্পর্ক ছিল। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যসহ একাধিক ক্ষেত্রে তার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং তা ভারতীয় বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারত থেকে লাইন অফ ক্রেডিট তহবিলের বৃহত্তম প্রাপকদের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। ২০২২ সালে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মর্কিন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ছিল ২ বিলিয়ন ডলার।
তবে দুদেশের সম্পর্কের বর্তমান উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্বগুলো হলো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, যোগাযোগ এবং ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ খাতে অংশীদার হওয়া।
বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে এবং আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী আদানি গ্রুপ আগামী ২৫ বছরের জন্য ঝাড়খণ্ডের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেটের মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াও যুদ্ধবিমান এবং সামরিক হেলিকপ্টারসহ বাংলাদেশ ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি
ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি একটি সহযোগিতামূলক ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো স্বার্থ নেই এমন কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেকে জড়ায় না বাংলাদেশ। যদিও এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে সম্পূর্ণরূপে অর্জিত করতে পারে না, তবুও ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বিদ্বেষ নয়’ ধারণাটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল হয়ে উঠেছে।
গত ২৪ এপ্রিল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ইন্দো-প্যাসিফিক সম্পর্কে দেশটির দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। সেখানেও বাংলাদেশ তার স্বাভাবিক পররাষ্ট্র নীতির প্যাটার্ন অনুসরণ করেছে এবং একটি ‘মুক্ত, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ, সুরক্ষিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক’ ভিশনের সঙ্গে সকলকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যেখানে ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশ।
ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গিও বাংলাদেশের মতোই। ভারতও একটি মুক্ত এবং নিয়মতান্ত্রীক ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিকে সমর্থন করে। তবে এখানে একটি পশ্চিমা তির্যক দৃষ্টি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে নিরপেক্ষ নথিতে।
পশ্চিমারা তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া উভয়ের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। কোয়াড নিরাপত্তা জোটের সদস্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশকে পশ্চিম ও ভারতের জন্য তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনের একটি আদর্শ অংশীদার করে তোলে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, দেশের অস্থিতিশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশাধিকার এবং বঙ্গোপসাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার শুধু বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে।
নয়াদিল্লি এ বিষয়ে সচেতন এবং আঞ্চলিক প্রচার ছাড়াও বহু-ক্ষেত্রীয় প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ভারত তার ‘বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ’ (বিমসটেক)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বানিয়েছে।
ভারতের জি-২০ প্রেসিডেন্সি এবং বাংলাদেশ
২০২৩ সালের জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছে ভারত। ঐতিহ্য অনুসারে এ সম্মেলনে অ-সদস্য দেশগুলোকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছে বাংলাদেশ। ভারত তার প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এবং তার ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনে বাংলাদেশের ভূমিকাকে কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এটি তার প্রমাণ দেয়।
এ ছাড়াও, ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়েই ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (CEPA) স্বাক্ষর করতে চাইবে যা এশিয়ান নেটওয়ার্ক রুট (AH-1 এবং AH2) এবং বিমসটেকের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে ভবিষ্যতের বাণিজ্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য ভারত এবং বাংলাদেশ লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে ভারতীয় রুপিতে তাদের বাণিজ্য নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সবশেষে, CEPA একটি যৌথ উৎপাদন কেন্দ্র এবং নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন তৈরির সুযোগ উন্মোচন করবে। এই আঞ্চলিক সংযোগকে ব্যবসায়িক সুবিধায় রূপান্তরিত করতে হবে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত হবে।
দুই সরকারের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনের অংশীদার করতে ঢাকাকে রাজি করাতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে ভারতীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রণোদনা দিতে হবে।
মূল – রত্নদীপ চক্রবর্তী এবং একামপ্রীত কৌর
ভাষান্তর – মুজাহিদুল ইসলাম
মন্তব্য করুন