

তপশিল ঘোষণার পরদিনেই এক ভয়াবহ হামলার শিকার হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। গত শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরে বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেল থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। দুর্বৃত্তরা সরাসরি তার মাথায় গুলি করে। এই মুহূর্তে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালে ওসমান হাদি। ওসমান হাদির ওপর এই প্রাণঘাতী হামলা প্রায় ১৩ বছর আগে পাকিস্তানের এক মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর এমনই এক হামলার শিকার হয়েছিলেন নারী শিক্ষার অধিকারের প্রতীক মালালা ইউসুফজাই।
ঘটনাটি ঘটেছিল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকায়। ১৫ বছর বয়সী মালালা সেদিন তার বন্ধুদের সঙ্গে বাসে চেপে স্কুলে যাচ্ছিলেন। আচমকা তালেবানের এক বন্দুকধারী বাসে উঠে মালালার দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বুলেটটি তার মাথার এক পাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে, প্রথম কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসকরা তার বাঁচার কোনো আশাই দেখতে পাননি।
মালালাকে দ্রুত পেশোয়ারের একটি সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সেনা নিউরোসার্জন কর্নেল জুনায়েদ খান তাকে পরীক্ষা করে দেখেন এবং নিশ্চিত হন তার অবস্থা অস্থিতিশীল। চার ঘণ্টার মধ্যে মস্তিষ্কে ফোলা বেড়ে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রথম দিকে মালালার পরিবার অস্ত্রোপচারে রাজি না হলেও, জুনায়েদ খান তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, অস্ত্রোপচার না করলে মালালার মৃত্যু হতে পারে, অথবা সে কথা বলার ক্ষমতা হারাতে পারে। অবশেষে মধ্যরাতের পর অস্ত্রোপচার শুরু হয়। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খুলির একটি অংশ সরানো হয় এবং মস্তিষ্কে জমা রক্ত পরিষ্কার করা হয়। যদিও এই অস্ত্রোপচারে প্রাথমিক সুরক্ষা মেলে, তবুও সংক্রমণ এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যর্থতার কারণে পরবর্তী দিনে তাকে মেডিক্যালি ইন্ডিউসড কোমায় রাখা হয়। এই অনিশ্চিত সময়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানির ব্যক্তিগত উদ্যোগে মালালাকে যুক্তরাজ্যের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, মালালার বেঁচে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে। সেগুলো হলো, গুলি সরাসরি মস্তিষ্কের মূল অংশে লাগেনি, দ্রুত চিকিৎসা এবং সময়মতো অস্ত্রোপচার এবং সর্বোপরি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার। দীর্ঘ চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মালালা হাঁটতে, লিখতে এবং পড়তে সক্ষম হন।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তার অদম্য মানসিক শক্তি ও বাঁচার প্রবল ইচ্ছাশক্তি তার দ্রুত সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পরেও মালালা থেমে যাননি। বরং তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং বিশ্বজুড়ে নারী শিক্ষার অধিকার ও সচেতনতার জন্য আন্দোলন শুরু করেন।
পরবর্তীতে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, যা তাকে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ীর মর্যাদা এনে দেয়। মালালা নিজেই বলেছেন, এই হামলার ঘটনা তাকে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী করেছে।
মন্তব্য করুন