আড্ডাটা জমেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের পাঁচ শিক্ষার্থী জুয়েল, নুর হোসেন, কণা, শন্তু ও সৌরভদের মধ্যে। তাদের কথাবার্তা টুকে নিয়েছেন মারুফ হোসেন-
শন্তু : একটু লেট হয়ে গেল।
জুয়েল : পড়াশোনা নিয়ে পড়ে থাকলে লেট তো হবেই। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টদের আড্ডা দেওয়ার সময় কই। তোর উচিত ছিল মহাকাশ নিয়ে পড়া। তাহলে আমরাও আজ চাঁদে...।
সৌরভ : আজকাল দেখি ক্লাসেও গভীর চিন্তায় পড়ে যান ভাই, মাঝেমধ্যে অ্যাটেনডেন্স মিস হয়, পরিসংখ্যানের নতুন সূত্র আবিষ্কার হচ্ছে নাকি মনে রং লেগেছে?
কণা : ঘটনা কী জুয়েল?
জুয়েল : আমি বিশুদ্ধ সিঙ্গেল।
নুর হোসেন : পড়ুয়াদের কোনো কিছুর সময় নেই।
কণা : (সৌরভকে) ভালো কথা, আমাকে পাইথনটা শিখিয়ে দিবি?
সৌরভ : ওকে। তবে অনলাইনে কোর্সের অভাব নেই। ডাটা সায়েন্টিস্ট হতে গেলে এটা শিখতেই হবে। নুর হোসেনকে নিয়ে চিন্তায় আছি। ও পড়া নিয়ে বেশি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। রকেট সায়েন্টিস্ট হলেই পারত। সোজা চাঁদে পাঠিয়ে দিতাম।
নুর হোসেন : এত চাঁদ চাঁদ করছিস কেন। ভারত পাঠিয়েছে চন্দ্রযান। আমি পাঠাব শনিযান। শনির দশা কাটাব।
শন্তু : ভালো কথা, আমরা চন্দ্রাভিযানে যেতে পারব?
জুয়েল : আমাদের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আছে। স্পারসো আছে। তবে সময় লাগবে। এসব একদিনে হয় না। ইসরোর শুধু রকেট উৎক্ষেপণের জন্য ৪০ হাজার একর জমি লেগেছে শ্রীহরিকোটায়। আমাদের এত খালি জমি কোথায়।
কণা : আচ্ছা, বিসিএস দিয়ে কি মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় চাকরি পাওয়া যায়? ধর কেউ ইতিহাসে পড়াশোনা করে...। (হেসে উঠল সবাই)
শন্তু : এসব ক্ষেত্রে অন্তত সায়েন্টিস্টদেরই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। যাই হোক, এখনো এসব নিয়ে মন্তব্য করার সময় হয়নি।
জুয়েল : কিন্তু লাভ কী! দেশের অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও শেষে স্যাটেলাইটের মতো ওই বিসিএসকে ঘিরে চক্কর খায়। গবেষণা করা যে মানুষের কাজ এটা বুঝতেই চায় না।
শন্তু : কেন যাবে না বিসিএসে? ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে বিরাট গবেষক হয়ে যদি সব সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া যায় তবে তো বিসিএসই ভরসা।
সৌরভ : কেউ কঠিন পড়াশোনা করে চাকরিতে গেলেও বিসিএস ক্যাডারের মতো ক্ষমতা পায় না। এ কারণেই বোধ হয়...।
নুর হোসেন : এত ক্ষমতার দরকারটা কী শুনি! মূল সমস্যা গবেষণার বরাদ্দে। সরঞ্জামেরও ঘাটতি আছে।
শন্তু : আমি ভাই আশাবাদী। পরিবর্তন আসবে। স্যাটেলাইট যেহেতু গেছে, রকেটও যাবে। দেশে আড়ালে-আবডালে রকেট সায়েন্টিস্টের অভাব নেই।
কণা : দেখ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা গরিব আর মধ্যবিত্ত তারা পরিশ্রম ছাড়া বিকল্প পথ খোঁজে না। তাদের জন্য একটা বৃত্তির ব্যবস্থা করে অন্তত খরচের টেনশনটা কমানো গেলে দেশে লাখ লাখ বিজ্ঞানী তৈরি হবে। অনেক নতুন কিছু উদ্ভাবন হবে।
সৌরভ : কিন্তু আমাদের নুর হোসেনের গবেষণা নাকি পাঙাশ মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছে?
শন্তু : ভালো তো। আমাদের উদ্যোক্তাও দরকার আছে। প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর উদ্যোক্তা।
জুয়েল : ভার্সিটিতে পড়ে করবে মাছ চাষ, এ কথা শোনার ভয়েই তো অর্ধেক উদ্যোক্তার স্বপ্ন চুরমার। সুতরাং আবার সেই বিসিএসের নোট-গাইড নিয়ে দৌড়াও, সাঁতরাও, হাবুডুবু খাও। সরকারি চাকরি না পেলে জীবনের সতেরো আনাই তখন বৃথা।
সৌরভ : মাছচাষের কথা শুনে খিদে লেগে গেল, কণা নাকি ভালো রাঁধে?
কণা : এ খবর কি চাঁদে গিয়ে জানলি?
সৌরভ : মাঝে মাঝে রেসিপি নিয়ে আলাপ করিস শুনি..।
জুয়েল : তো কণা কবে খাওয়াচ্ছিস?
কণা : বাজার করে দিলে রান্নায় আপত্তি নেই।
শন্তু : রান্নাবান্নার কথায় আবার নস্টালজিক হয়ে গেলাম। একটু পর সবাই যার যার হলে আর বাসায় যাব। বিদায় নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিদায় নেব। এসব দিন চলে যাবে। পরে কি মনে পড়বে যে আড্ডায় আমরা দুনিয়া বদলানো কত গল্পটল্প করেছি।
জুয়েল : মনটা খারাপ হয়ে গেল রে। তোদের ছেড়ে থাকা যাবে না। যাহ, কথা দিলাম, আমি চাঁদে গেলে তোদেরও নিয়ে যাব।
কণা : চাঁদে পরে। আপাতত বাসায় সফট ল্যান্ডিং করতে হবে। পড়া রিভিশন দিতে হবে। তা না হলে কিছুই মনে থাকবে না।
নুর হোসেন : অবজেকশন! এই রিভিশন স্টাইলের ঘোর বিরোধী আমি। পড়াশোনা হবে বিনোদনের মতো। তুই যে রান্না জানিস, সেসব কি তোকে রিভিশন দিতে হয়? রিভিশন বলে কিছু নেই বুঝলি! তুই যা শিখেছিস সেটা অন্যকে শেখানোর চেষ্টা কর। প্র্যাকটিক্যালি করে দেখ। তাহলে দেখবি আর রিভিশন নিয়ে টেনশন করা লাগবে না। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছেন...।
সৌরভ : শুরু হয়ে গেছে লেকচার। আমি ভাগি।
শন্তু : আমিও বা বাদ থাকব কেন! চাঁদ মামা! আমি আসছি!
মন্তব্য করুন