বিশ্ববিদ্যালয় মানেই আমরা দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জানি; পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বেসরকারি নর্দান ইউনিভার্সিটি যেন এক ‘পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়’! কারণ, এ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর ট্রাস্টি বোর্ড রয়েছে এক পরিবারের দখলে।
অভিযোগ উঠেছে, অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এনইউবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি দখল করেছেন। শুধু তাই নয়, দখলের পর সেটিকে রূপ দিয়েছেন ‘পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে’। অধ্যাপক ইউসুফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পরিচালকও।
সূত্রে জানা গেছে, আগের ট্রাস্টিদের সরিয়ে এনইউবি দখলের পর অধ্যাপক আবদুল্লাহ নতুন বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) গঠন করেন। যেখানে ৯ জনের মধ্যে তিনি ছাড়াও তার পরিবারের আরও সাত সদস্য রয়েছেন।
সম্প্রতি অধ্যাপক আবদুল্লাহ পরিবারের দখলে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়টি ফেরত পেতে নিম্ন আদালতে মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তারা। তারা রাষ্ট্রপতির কাছেও চিঠি দিয়েছেন। শিগগির উচ্চ আদালতে গিয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০২ সালের ২৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন নর্দান ইউনিভার্সিটির উদ্যোক্তারা। অধ্যাপক ড. শামসুল হক, লুৎফর রহমান, বোরহান উদ্দিনসহ সাতজন তরুণ উদ্যোক্তা এ আবেদন
করেন। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি সংক্ষেপে ‘আইবিএটি ট্রাস্ট’ নামে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৭ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি দেয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে করা হয় অস্থায়ী ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শুরুর দিকের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামসুল হকসহ অন্য ছয় সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা শুরু করেন। ২০০৮ সালে আইবিএটি ট্রাস্টের ১২তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে দুজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১১ সালে অধ্যাপক শামসুল হক উপাচার্য হিসেবে তার একক সিদ্ধান্তে তাদের চাকরিচ্যুত করেন। ওই বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কার্যালয় কারওয়ান বাজার থেকে বনানীতে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক শামসুল হকের হাত ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আসেন অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ। মূলত অধ্যাপক শামসুল হকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার এক সময়কার ছাত্র ও পরবর্তীকালে সহকর্মী অধ্যাপক আবদুল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। একই সঙ্গে তাকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য করার প্রস্তাবও করেন। পরে তিনি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হন। এরপর উদ্যোক্তাদের অগোচরে শামসুল হকের যোগসাজশে অধ্যাপক আবদুল্লাহ তার পরিবারের সদস্যদের ট্রাস্টি করে এনইউবি ট্রাস্ট গঠন করেন। তখন থেকে তিনি মূল উদ্যোক্তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেন।
নতুন ট্রাস্টি বোর্ডে আগের সাত ট্রাস্টির ছয়জনই বাদ পড়েন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ বোর্ডের সদস্য হয়ে নিজের পছন্দসই আটজনকে বোর্ডে মনোনয়ন দেন। আগের বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক শামসুল হককে বোর্ডের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। নয় সদস্যের এ বোর্ডে স্থান পান আবদুল্লাহর পরিবারের সাত সদস্য। এর মধ্যে তার মেয়ে লাবিবা আবদুল্লাহর বয়স কম ছিল; কিন্তু কাগজে বয়স বাড়িয়ে তাকে সদস্য করা হয়। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান করেন স্ত্রী হালিমা সুলতানা জিনিয়াকে। তিনি হন বোর্ডের চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও বর্তমানে বোর্ডে রয়েছেন মা দোলেনা খানম, বাবা আনসার আলী, ছেলে সাদ-আল-জোবায়ের আবদুল্লাহ, মেয়ে লাবিবা আবদুল্লাহ, বোন মোসাম্মৎ হাবিবুন নাহার এবং বোনের ছেলে নাজমুস সাদাত। তারা সবাই বোর্ডের সদস্য।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন কয়েকজন ট্রাস্টি জানান, অধ্যাপক শামসুল হকও বিশ্ববিদ্যালয়টির শীর্ষপদে বেশিদিন থাকতে পারেননি। ২০১২-১৩ সালের দিকে তাকেও নীতিনির্ধারণী সব কাজ থেকে অব্যাহতি নিতে হয়। ট্রাস্টি বোর্ডে তাকে রাখা হয় নামমাত্র সদস্য করে।
প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তারা বলছেন, কোনো ধরনের আইনের তোয়াক্কা না করেই তাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে নানা ভয়ভীতি দেখানো ও মামলার হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি তাদের বাদ দিতে অধ্যাপক আবদুল্লাহ স্বাক্ষরও জাল করেন। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া অর্থ স্থায়ী তহবিলে জমা না করে দুবাই-মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে পাচার করেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান। আবদুল্লাহ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋণ বাড়তে থাকে। ট্রাস্টের অধীনে থাকা সম্পত্তি করায়ত্ত করেছেন তিনি। এ ছাড়া আগের সদস্যদের দমাতে দিয়েছেন বিভিন্ন ধরনের মামলাও।
তারা বলছেন, আইবিএটি ট্রাস্টের অধীনে নর্দান ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ছিল। ২০১০ সালের দিকে এসে ট্রাস্টের অন্যতম উদ্যোক্তা আবু বকর সিদ্দিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, যিনি ট্রাস্টের অধীন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে সব ধরনের আর্থিক কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। আবু বকর অসুস্থ হয়ে পড়ায় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় আইবিএটি ট্রাস্টে সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়। আর এই সময়েই অধ্যাপক আবদুল্লাহকে এনইউবিতে আনেন শামসুল হক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি অধ্যাপক আবদুল্লাহ রিয়েল এস্টেট কোম্পানি প্রাসাদ নির্মাণ লিমিটেডেরও মালিক। সে কারণে তার ট্রাস্টি হতে সে সময় তেমন কোনো বেগ পেতে হয়নি। অন্যদিকে, ২০১১ সালে আবু বকর সিদ্দিক মারা গেলে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ।
এসব বিষয়ে জানতে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহর মোবাইল নম্বরে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করলেও সাড়া দেননি। ই-মেইল করলেও জবাব আসেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সূত্র জানিয়েছে, তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর তিনি সর্বশেষ ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ২০১১ সালের ২৮ মার্চ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে আইবিএটি ট্রাস্টের সদস্য হয়ে ট্রাস্টের অধীনে সব প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ। স্মারকে উল্লেখ ছিল, ট্রাস্টের মূল প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নর্দান মেডিকেল কলেজ পরিচালনার জন্য আইন অনুযায়ী নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে অনুযায়ী অধ্যাপক আবদুল্লাহ প্রাসাদ নির্মাণ লিমিটেডের মাধ্যমে ট্রাস্টের সদস্য হওয়ার আগ্রহ দেখান। তার আগ্রহের কারণেই এ সমঝোতা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের মতে, সেই সমঝোতা স্মারকে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—বর্তমান ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎকালীন ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যতে পরিচালনার জন্য কোনো ঋণ বা ফান্ড প্রয়োজন হলে সেই দায়িত্ব নেবেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ। সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অনুদানের কথাও উল্লেখ করা হয়; কিন্তু সমঝোতা স্মারক ৩০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সেটি হয়নি। পরবর্তী সময়ে আরেকটি সমঝোতা স্মারক জাল করে মূল উদ্যোক্তাদের বের করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় দখলে নেন তিনি।
প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের তৎকালীন এক প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার প্রভাব খাটিয়ে উদ্যোক্তাদের নানা ভয়ভীতি দেখাতেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ। কখনো তাদের বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টতা আবার কখনো অবৈধ ক্যাম্পাসের কথা বলে ভয়ভীতি দেখাতেন।
তাদের অভিযোগ, ২০১১ সালের ২৭ জুলাই প্রতিষ্ঠাকালীন ছয়জন উদ্যোক্তার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ। স্বাক্ষর জাল, জোরপূর্বক দখল এবং ট্রাস্টের নাম পরিবর্তন করে এর সম্পদ নিজেদের নামে লিখে নিয়ে বছরে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। বর্তমানে ব্যাংকের দেনা পরিশোধ না করায় এবং ব্যাংক গ্যারান্টি তাদের নামে থাকায় অর্থঋণ আদালতে চারটি মামলা চলছে।
এ ছাড়া ২০২২ সালের শুরুতে ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জাল দলিলে জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগে নর্দান ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই)। সংস্থাটি সে সময় জানিয়েছিল, আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্টের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার করা মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। মামলায় তিনি ছাড়াও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে জাল-জালিয়াতি করে জমি দখল, প্রতারণা ও হুমকির অভিযোগ আনা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ফিরতে চান প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তারা: বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকালীন সাত উদ্যোক্তার মধ্যে অধ্যাপক শামসুল হক বর্তমানে শয্যাশায়ী। মো. আবু বকর সিদ্দিক মারা গেছেন। বাকি পাঁচজনের মধ্যে আয়েশা আক্তার বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। অন্যরা হলেন মো. আবু আহমেদ, মো. লুৎফর রহমান, বোরহান উদ্দিন ও মো. রেজাউল করিম।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দখল করা ট্রাস্ট ফেরত পেয়েছেন উদ্যোক্তারা। নর্দানের উদ্যোক্তারাও সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তা বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘অধ্যাপক আবদুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শুধু আমাদের নয়, অধ্যাপক শামসুল হককেও বের করে দিয়েছেন। এরপর থেকে তার পরিবার বিশ্ববিদ্যালয় দখলে নেয়। আমরা দখলকৃত এই বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ফেরত চাই। এজন্য মামলাও চলমান এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় আচার্যসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।’
আরেক উদ্যোক্তা ও ট্রাস্টের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু আহমেদ বলেন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ সে সময় আওয়ামী লীগের দাপট দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি জবরদখল করেছিলেন। সরকারের পট পরিবর্তনের পর অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম দুর্বৃত্তায়নকারীরা পলায়ন করছে। আগের ট্রাস্টিরা ফিরে আসছে, আমরাও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত পেতে চাই।