কামরাঙ্গীরচরে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল করতে চায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির এ পরিকল্পনায় বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, সেবামূলক কাজ করা সিটি করপোরেশনের কাজ। তা না করে শত বছর ধরে বসবাসরত প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত করে এমন প্রকল্প নেওয়া কতটা যৌক্তিক।
শুক্রবার (৮ মার্চ) কামরাঙ্গীরচর নাগরিক পরিষদের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ড্যাপ-কামরাঙ্গীরচর, অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন এবং জনগণের ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে শঙ্কার বিষয়ে জানান ওই এলাকার বাসিন্দারা।
গত বছরের ১১ অক্টোবর কামরাঙ্গীরচরে এক অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছিলেন, তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া ওই এলাকায় কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক অঞ্চল হবে। কামরাঙ্গীচরে পরিকল্পিত আবাসন, পাঁচ তারকা হোটেল, কনভেনশন হল, ৫০ তলাবিশিষ্ট নান্দনিক ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর হয়ে চার সারির সড়ক নির্মাণ করা হবে। এভাবেই কামরাঙ্গীরচরকে একটি আধুনিক নগরীতে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির এমন পরিকল্পনার প্রতিবাদে বৈঠকে স্থানীয়রা বলেন, তারা জানতে পেরেছেন পুরো এলাকার ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাস্তুচ্যুত করে সেখানে এই প্রকল্প নেওয়া হবে। সেখানে ১ হাজার ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৫০ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে বলেও তারা মেয়রের বক্তব্যে জানতে পেরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের না জানিয়ে এমন প্রকল্প নেওয়ায় তারা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
কামরাঙ্গীরচরে কী ধরনের প্রকল্প হবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে নানা মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন জানিয়ে তারা বলেন- কখন, কীভাবে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হবে, তারা এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি। এমন পরিস্থিতিতে সিটি করপোরেশন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে, কামরাঙ্গীরচরে যাতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া না হয়। সিটি করপোরেশনের চিঠি পেয়ে রাজউক এখন আর কামরাঙ্গীরচরে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না।
স্থানীয় লোকজন বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত কামরাঙ্গীরচর এলাকা। এ এলাকায় ২০ হাজারের বেশি ভবন রয়েছে। মিশ্র ভূমি ব্যবহারের এ এলাকায় শত শত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে। কামরাঙ্গীরচর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অধিভুক্ত। এখানে কোনো প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন রাজউকের কাজ। ড্যাপে কামরাঙ্গীরচর আবাসিক প্রধান মিশ্র এলাকা। এখানে ডিএসসিসির বাণিজ্যিক হাব বিষয়টি আইনসঙ্গত নয়। ড্যাপের বাইরে গিয়ে বাণিজ্যিক হাব করা হবে বেআইনি। ডিএসসিসি যদি কামরাঙ্গীচরে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে তা করতে হবে সেখানকার ২০ লাখ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। তাদের বাদ দিয়ে নয়।
বৈঠকে কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে কামরাঙ্গীরচরে বসবাস করে আসছেন। ডিএসসিসির প্রকল্পকে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি উচ্ছেদ করা হয়, তারা কোথায় যাবেন? শাহ আলম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, মেয়র তাদের বলেছেন, ‘তোমরা টাকা পাবা অন্য জায়গায় গিয়ে থাকবা।’ এটা অবাস্তব পরিকল্পনা। এটা বাতিল করতে হবে।
মো. দুলাল নামে এক বাসিন্দা বলেন, কামরাঙ্গীরচরের প্রতিটি অলিগলিতে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। উন্নয়ন কাজের ব্যত্যয় হোক, তা আমরা চাই না। আমাদের ওই এলাকায় রেখেই যাতে উন্নয়ন করা হয়, এটাই আমরা চাই।
ফারুক হোসেন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, আমরা যেমন সোজা ভাষায় কথা বলতে পারি, আবার বাঁকাও হতে পারি। প্রকল্পটি অন্য এলাকায় বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল একুশে ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত কবি নির্মলেন্দু গুণের। অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। তবে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্প যারা গ্রহণ করেছেন, তাদের সরে আসার আহ্বান জানাই। প্রকল্পটি মানুষের মধ্যে আশার চেয়ে ভীতির সঞ্চার করছে বেশি।
স্থানীয় লোকজনের মতামত নিয়ে কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, তেমন প্রকল্প নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে নির্মলেন্দু গুণ বলেন, জনগণের উপকার লাভ না দেখে প্রকল্প নেওয়া হলে কামরাঙ্গীরচরের মানুষ রুখে দাঁড়াবে। তিনিও সেই আন্দোলনে যুক্ত থাকবেন।
মন্তব্য করুন