মোস্তাফিজার রহমান, পীরগাছা (রংপুর)
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৭:৫৬ এএম
অনলাইন সংস্করণ

প্রমত্তা তিস্তা এখন যেন ধু-ধু মরুভূমি

শুকিয়ে যাওয়া তিস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে করে পণ্য পরিবহন করছেন কৃষকরা। ছবি : কালবেলা
শুকিয়ে যাওয়া তিস্তায় ঘোড়ার গাড়িতে করে পণ্য পরিবহন করছেন কৃষকরা। ছবি : কালবেলা

বর্ষা মৌসুমে যে তিস্তা নদী প্রতিবছর প্রমত্তারূপে আবির্ভূত হয়, তারই বুকে এখন শুধু ধু-ধু বালুচর। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও তাও নেই। যার করালগ্রাসে মানুষ ভিটেমাটি হারায়, সেই নদী এখন শুকিয়ে যেন মৃতপ্রায়।

নৌকা চলাচল বন্ধ, মানুষজন হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছেন এই বিশাল নদী। তিস্তার এই শুষ্ক রূপ দেখে মনে হবে, এটি যেন এক মরুভূমি।

শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রংপুরের পীরগাছা উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর কয়েকটি পয়েন্ট ঘুরে তিস্তার এই করুণ চিত্র দেখা গেছে।

এসময় গাবুড়ার চরের কৃষক কাইয়ুম আলী বলেন, যখন হামার পানির দরকার নাই, তখন ভারত পানি ছাড়ি হামার সর্বনাশ করে। আর এখন হামার পানি দরকার, এখন পানি নাই। পানির অভাবে ঠিকমতো চাষ করবার পারছি না। এর একটা সমাধান দরকার।

সত্তরোর্ধ্ব হামিদা বেগম বলেন, মোর স্বামী মরি গেইচে, ছাওয়া-পোওয়া নাই। এযাবত ১৫-১৬ বার তিস্তা হামার বাড়ি ভাঙিছে। এখন মানষের জমিত থাকি। হামার দুঃখ দেখার কেউ নাই।

নদীপাড়ের জেলে আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, এক সময় নদীতে প্রায় সারা বছর পানি থাকতো, মাছ ধরে সংসার চালাতাম। এখন বছরের বেশিরভাগ সময় পানি থাকে না। এখন রিকশা চালাই, দিনমজুরি করি। অনেকে পেশা বদলেছে।

তিস্তা পাড়ের শিক্ষিত যুবক ফুয়াদ শাহরিয়ার কালবেলাকে বলেন, বর্ষায় যখন আমাদের পানির প্রয়োজন নেই তখন ভারত পানি ছেড়ে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করে। মানুষের জমিজমা, বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়। আর যখন পানি দরকার তখন দেয় না। যার ফলে আজ নদীর এই দুর্দশা। পানি না থাকায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, নদীকেন্দ্রিক পেশাজীবীরা বেকার হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে দ্রুত নদীটি খনন করা দরকার। সেই সঙ্গে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করাও জরুরি।

নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে তিস্তার উৎসস্থল থেকে বিভিন্ন বাঁধ ও সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাপক হারে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে ন্যূনতম প্রবাহও থাকছে না। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ গলনের ধরন বদলে গেছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে নদীকেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এখনও কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি। বিগত সরকারের সময়ে বহুবার তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে জুলাই’২৪ পরবর্তীতে তিস্তা নদী রক্ষার আন্দোলন বেশ জোরদার হয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তিস্তা নদীর ১১টি পয়েন্টে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ। অন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারাও আসছেন তিস্তা পাড়ের মানুষের দুঃখ-দূর্দশার কথা শুনতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তার এই করুণ অবস্থা উত্তরবঙ্গের কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ সংকেত। দ্রুত সমাধান না বের করতে পারলে এই সংকট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তাই দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে, যাতে শুষ্ক মৌসুমেও তিস্তার পানিপ্রবাহ বজায় থাকে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিকল্প জলাধার তৈরি ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের উপায় বের করতে হবে। তিস্তা নদী খনন ও পুনরুজ্জীবিত করারও উদ্যোগ নিতে হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকপ্রস্তাব

উন্নত ফর্মুলা ও আধুনিক প্যাকেজিংয়ে বাজারে ফিরেছে পন্ডস সুপার লাইট জেল

বিশ্বকাপে হঠাৎ সুযোগের পর বড় সংকটে স্কটল্যান্ড

পাচারের সময় ২০০ বস্তা সার জব্দ করল স্থানীয়রা

বিএনপিতে যোগ দিলেন আ.লীগ নেতা

এনসিপির প্রার্থীসহ দুজনকে জরিমানা

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ / বিদায়ের পর আইসিসির দিকে বাংলাদেশের অভিযোগের তীর 

আফগান আদালতে অপরাধ নয়, শ্রেণি দেখে শাস্তি

শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়তে প্রতিদিনের কথার গুরুত্ব

সিম কার্ডের এক কোনা কেন কাটা থাকে

১০

ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে ২ শিক্ষার্থী নিহত

১১

তিতাসের নেতৃত্বে ঐশী-রিফতি

১২

ভারত থেকে এলো ৫১০ টন চাল

১৩

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজে চাকরির সুযোগ

১৪

বিমান দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী নিহত

১৫

মদ্যপ অবস্থায় সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার গ্রেপ্তার

১৬

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ৪ বছরে হতাহত ১৮ লক্ষাধিক সেনা

১৭

খুলনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী বকুলকে শোকজ

১৮

হরমুজ প্রণালির আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করল ইরান

১৯

ইতালির ইমিগ্রেশন এবং নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় একাধিক পরিবর্তন

২০
X