প্রদীপ মোহন্ত, বগুড়া ও রিয়াজ মাহমুদ, গাবতলী
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:১৫ এএম
অনলাইন সংস্করণ

১৩০ বছরের ‘জিয়া বাড়ি’ আজও অবহেলিত

বগুড়ার গাবতলীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ‘জিয়া বাড়ি’। ছবি : সংগৃহীত
বগুড়ার গাবতলীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ‘জিয়া বাড়ি’। ছবি : সংগৃহীত

আজ ১ সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আজকের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বগুড়াতেই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন সেই বাড়িটি আজও অবহেলিত।

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়নের বাগবাড়ীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শেষ স্মৃতিচিহ্ন স্মৃতিবিজড়িত ‘জিয়া বাড়ি’ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করলে একদিন হয়তো বাড়িটি হারিয়ে যাবে এমন আশঙ্কা এলাকাবাসীর। বর্তমানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ বাড়ি পরিদর্শনে আসছেন। দর্শনার্থী, স্বজন ও এলাকাবাসী ১৩০ বছরের এ দোতলা বাড়িটি অক্ষত রেখে সেটা জিয়া স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়েছেন।

তবে এই বাড়ির উন্নয়নের সব কিছুই আটকে আছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর।

বাগবাড়ী গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি মন্তেজার রহমান তালুকদার বলেন, জিয়াউর রহমানরা ছিলেন মণ্ডল পরিবারের। তার দাদা পাশের মহিষাবান গ্রামের কামাল উদ্দিন মণ্ডল বাগবাড়ীতে এসে তৎকালীন জমিদার পরিবারের মেয়ে মিছিরুন নেছাকে বিয়ে করেন। মিছিরুন পৈতৃকসূত্রে ৫০০ বিঘা জমি পান। তাই স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই সংসার শুরু করেন। ওই দম্পতির সংসারে সাত ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম হয়। ছেলেদের মধ্যে মনসুর রহমান পঞ্চম সন্তান। তিনি জাহানারা বেগম রানীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় চার ছেলে সন্তান। দাদা কামাল শখ করে ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় নাতির নাম রাখেন জিয়াউর রহমান কমল। কমল নামটি ছিল জিয়ার পারিবারিক ডাকনাম। জিয়া স্থানীয় বাগবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তৃতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়ার সময় বাবা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনসুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান। এরপর দীর্ঘদিন গ্রামবাসী ও স্বজনদের সঙ্গে জিয়ার দেখা হয়নি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাগবাড়ীতে এলে আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী তাকে দেখেন।

জিয়াউর রহমানের পূর্বপুরুষরা ১৮৯৫ সালে বাগবাড়ী গ্রামে একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। ১৩০ বছরের প্রাচীন বাড়িটি বর্তমানে ‘জিয়া বাড়ি’ হিসাবে পরিচিত। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালে এটি দোতলা করা হয়। তারেক রহমান গ্রামে এলে এ দোতলায় বিশ্রাম নিতেন। বাড়ির প্রবেশমুখে লেখা আছে, ‘জিয়া বাড়ি, বাগবাড়ী, বগুড়া।’ বাড়ির ভেতরে পশ্চিম পাশে একটি দোতলা পাকা ঘর। ওই পাকা ঘরের সামনের দেয়ালে বাড়ি নির্মাণের তারিখ লেখা, ‘২২শে আষাঢ় ১৩০২ সন, ১৮৯৫ সাল।’

বর্তমানে জিয়া বাড়ি দেখাশোনা করেন জিয়া পরিবারের আত্মীয় রোকেয়া তালুকদারসহ অন্যরা। ঘরের ভেতরে জিয়ার আমলের একটি খাট, ড্রেসিং টেবিল, সোফা ও সামান্য কিছু আসবাবপত্র রয়েছে। এ ছাড়া জিয়াউর রহমান যে খাটে ঘুমাতেন, সে খাটের সঙ্গের বোতাম সেট করা মশারি, জমিদার আমলের কাচের গ্লাস অনেক আগেই চট্টগ্রাম জাদুঘরে রাখা হয়েছে। বাড়িটিতে রয়েছে একটি বিশেষ কক্ষ। সে কক্ষে রাখা হতো নিরাপত্তার জন্য দামি জিনিসপত্র। ঘরটির পেছনে ঘাটসহ একটি পুকুর, বাড়ির সামনের অংশে বড় পরিসরের খোলা জায়গা রয়েছে। জিয়ার বাড়ির পূর্বপাশে সরোবর খালটি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে এ এলাকার কৃষিজমিতে সেচের জন্য নিজেই খনন করেছিলেন। জিয়ার স্মৃতি ধরে রাখতে বাড়িটি নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়নি।

জিয়া পরিবারের সদস্য প্রয়াত বাচ্চু তালুকদারের স্ত্রী রোকেয়া তালুকদার বলেন, তিনি (জিয়া) সম্পর্কে আমার চাচাশ্বশুর হন। তাকে একবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী বাড়িটি দেখতে আসেন।

তিনি বলেন, এ বাড়িতে জিয়া ও তার অন্য তিন ভাইয়ের জন্ম হয়। জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর গ্রামের হাইস্কুলে এসেছিলেন; জিয়া পরিবারের সবাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের সঙ্গে গ্রামের সবার সুসম্পর্ক ছিল। খালেদা জিয়া এসে তাদের সবাইকে খুব আদর করতেন।

বাগবাড়ী গ্রামের মজিবর তালুকদার ও কয়েকজন প্রবীণ আরও জানান, গ্রামের কাদামাটি, পানি, জমির আইল ধরে বেড়ে ওঠা কিশোর জিয়াউর রহমান একদিন বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। নিজের মেধা, মনন, ত্যাগ আর দেশের জন্য ভালোবাসা ছিল বলেই তিনি বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে এক অনন্য জিয়াউর রহমান হয়ে উঠেছিলেন।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ভেলাবাড়ি গ্রামে থেকে জিয়া বাড়ি পরিদর্শনে আসা সাইদুর রহমান জানান, তিনি পরিবারসহ জিয়া বাড়ি দেখতে এসেছেন। সঙ্গে তার দুই স্কুলপড়ুয়া সন্তান রয়েছে। তারা জন্মের পর শহীদ জিয়ার নাম শুনেছেন। তার দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, বীরত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দেশ এবং জনগণের জন্য তার কর্মকাণ্ডের অনেক প্রশংসা শুনেছেন। তাদের অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল ‘জিয়া বাড়ি’ দর্শনের। সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তবে তারা এ বাড়ি দ্রুত জিয়া জাদুঘরে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন।

নশিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং জেলা বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী রাজ্জাকুল আমিন রোকন তালুকদার বলেন, জিয়াউর রহমান আমাদের পরিবারের গর্ব। তারেক রহমানের সহযোগিতায় তিনি নশিপুর গ্রামে শহীদ জিয়া রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন সেন্টার, জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন।

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র রেজাউল করিম বাদশা জানান, জিয়াউর রহমান শুধু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার বাড়িটি কোনোভাবেই সাধারণ থাকার কথা নয়; কিন্তু তিনি তো সাধারণ মানুষের উন্নয়নের কথা বলতেন। সে কারণে সাধারণ মানুষের মতো করেই স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বাড়িটি রয়েছে। মূল বাড়িটি রেখে আগামী প্রজন্মের মানুষকে জিয়া সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে একটি জাদুঘর করা যায় কি না সে বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বগুড়া-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু কালবেলাকে বলেন, জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যরা চান না বলেই এ বাড়ি সংস্কার করা হয়নি। তবে আগামীতে জিয়াউর রহমানের বাড়িকে ঘিরে নানামুখী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ঘুরতে আসেন। তাদের জন্য ভবিষ্যতে নানা দর্শনীয় স্থান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভারতীয় নাগরিকদের পুশইনের চেষ্টা / সীমান্তে উত্তেজনা, শক্ত অবস্থানে বিজিবি 

আজ রাতে তেহরান পুড়বে : বেন-গাভির

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইসরায়েলজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি

ভূমিকম্পের সময় যে দোয়া পড়বেন

বাসচালককে মারধর ও ছাত্রদল কর্মীকে কোপানোর অভিযোগ  

দেশের যেসব জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল যেখানে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

খেলতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই শিশুর

চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি

আরও বাড়ল ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়

১০

লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে আবারও যুদ্ধে নামব : ইরান

১১

‘বিশ্ব এলপিজি দিবস-২০২৬’ উদযাপন করল ফ্রেশ এলপি গ্যাস

১২

আর্জেন্টিনা যেন মিনি হাসপাতাল!

১৩

বিশ্বকাপ এলেই রং বদলান নেইমার

১৪

রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লেন জামায়াত আমির

১৫

সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে নতুন সমীকরণ, আলোচনায় নাসিম ফারুক খান মিঠু

১৬

বিশ্বকাপে সেদিন আবির্ভাব হয়েছিল এক ‘ফুটবল দেবতার’, নাম তার ম্যারাডোনা

১৭

লাশ নিয়ে থানা ঘেরাও, এস আই প্রত্যাহার

১৮

বাজেট ২০২৬-২৭ / মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

১৯

সেই তিন ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে জমা হলো ১২ লাখ টাকা

২০
X