বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সফলভাবে মোকাবিলা করে চলমান উন্নয়ন বজায় রাখা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ৩০ জুন জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে যত্ন ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পাস হওয়া নতুন অর্থবছরের (২০২৪-২৫) বাজেট বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এই বাজেটে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য ২১.৩১ শতাংশ বরাদ্দ ওয়াটার, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) খাতে দেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ ৯৬৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৩৮৫ কোটি টাকা বড় শহরগুলোতে ওয়াসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাকিটা চরাঞ্চল, উপকূল, পাহাড়ি অঞ্চলসহ পুরো দেশে ব্যবহৃত হবে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে সকলের জন্য 'সেফলি ম্যানেজড স্যানিটেশন' নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের যৌথ পরিবীক্ষণ কর্মসূচি ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিরাপদ ব্যবস্থাকৃত পানির কভারেজে ৫৯.০১% এবং নিরাপদ ব্যবস্থাকৃত স্যানিটেশনে ৩১% এ আছে। অর্থাৎ এখনো দেশের অর্ধেক অঞ্চল নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বাইরে। এই লক্ষ্য পূরণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক বিনিয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাকি অঞ্চলগুলোকে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় আনতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৯৬৩১ কোটি টাকার মধ্যে বড় শহরগুলোতে ওয়াসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৩৮৫ কোটি টাকা। তবে ওয়াসার জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ ৩৪৬৩ টাকা এবং সারাদেশের সাধারণ মানুষের সুপেয় পানির, উন্নত স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫৫৫ টাকা অত্যন্ত অপ্রতুল। এই অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এখনো নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা থেকে বঞ্চিত। ন্যায্যতার ভিত্তিতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত, যাতে প্রত্যেক নাগরিক সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা পেতে পারে।
সরকার জলবায়ু পরিবর্তন এবং একাধিক দুর্যোগের উপর দৃষ্টি রেখে ওয়াশ-এর উন্নয়নে গত অর্থবছরের ১১টি প্রকল্পের সাথে এই অর্থবছরে আরো ৮টি প্রকল্প নিচ্ছে। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে দেশের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। এসব অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা পৌঁছানোর মাধ্যমে দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক খাতে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। এই উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে এবং এসডিজি ৬ লক্ষ্য পূরণে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে এবং বরাদ্দও বাড়িয়েছে। এইসব উদ্যোগ ও বরাদ্দ সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি ৬ এর লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হবে।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং তা জনগণের জীবনমান উন্নত করতে সহায়তা করে। তাই, এই খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার কমে যায় এবং শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। ফলে, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিতে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক গ্রামাঞ্চলে এখনো স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত নয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। গ্রামাঞ্চলে স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বাজেট বরাদ্দের চ্যালেঞ্জের মাঝেও এই খাতের বিনিয়োগ অত্যন্ত প্রয়োজন এর অন্যতম কারণ সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কতৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস (এসভিআরএস) ২০২২ এর তথ্যমতে, নিরাপদ পানি ও নিরাপদ স্যানিটেশন এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধির অভাবে বছরে প্রতি লাখে ১৬৭ জন মারা যায়। এই চিত্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ফলে আগামী ৬ বছরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং নবম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৬ অর্জনে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৬ অর্জনে ওয়াশ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় ওয়াশ খাতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান: উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প এবং পানি ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ
মন্তব্য করুন