আনোয়ার ফারুক তালুকদার
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৩, ০৭:০৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হোক এবারের মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য 

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী গত মে মাসে মুল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া রিজার্ভ গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি রুটিন কাজ মুদ্রানীতি প্রণয়ন। আগে বছরে দুইবার মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হতো। কিন্তু মাঝে কয়েক বছর ধরে বছরে একটি মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হচ্ছে। এবার থেকে আবারও বছরে দুইবার করে মুদ্রানীতি প্রকাশ করা শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, আগামী ১৮ জুন ২০২৩ সময়ে নতুন মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হবে। এরই মধ্যে ‘কেমন মুদ্রানীতি চাই’ বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। অনেকেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মতামত প্রকাশ করছেন। মুদ্রানীতির মূল কাজ হচ্ছে অর্থ প্রবাহ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এবারের মুদ্রানীতিতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। কারণ দেশে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে আছে, অন্যদিকে রিজার্ভ দিন দিন কমছে, প্রবাসী আয় এবং ব্যাংক খাতে তারল্য নিয়ে একটা উদ্বেগ রয়ে গেছে। কোভিডের জন্য কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে খেলাপি ঋণ বিগত বছরে কম ছিল; কিন্তু খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি ঠিক রাখতে মুদ্রানীতি একটু ব্যতিক্রমধর্মী হওয়ার দাবি রাখে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হতে হবে এবারের মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাংক হার বৃদ্ধি করা অন্যতম কৌশল। এ ছাড়া নগদ জমার হার বাড়িয়ে বা বাজারে ঋণপত্র বিক্রি করে বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য উঠিয়ে নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। দেশের মূল্যস্ফীতি যদিও বেশ খানিকটা আমদানিনির্ভর এবং পরোক্ষভাবে ডলার সংকটজনিত। তাই বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলেও বাংলাদেশে কমছে না।

খোদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি টাস্কফোর্স প্রতিবেদন বলছে, ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্যের দাম কমছে না। এটি নিয়ন্ত্রণে তাই ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। জানা গেছে, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে টাকার সরবরাহ আগের মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণ ১৬ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করতে যাচ্ছে। এতে বাজারে টাকার জোগান কমবে বৈকি, কিন্তু তার প্রভাব ব্যাংক ঋণের ওপর কেমন পড়বে—তা দেখা দরকার।

অন্যদিকে সুদের হার বাড়ালে ঋণ নেওয়ার হার কমে বাজারে টাকা সরবরাহ কমে। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা ধীর হতে পারে। তবে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ ঠিক রেখে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের সহজলভ্যতা কমানো যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন গ্রাহক পর্যায়ে সুদ হারের ক্যাপ তুলে দেওয়ার জন্য। এবারের মুদ্রানীতিতে সেই ক্যাপ তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক সুদ হারের ঘোষণা আসতে পারে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘শর্ট টার্ম মুভিং এভারেজ রেট’, সংক্ষেপে স্মার্ট। ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদহারের ভিত্তিতে যা নির্ধারিত হবে। ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সঙ্গে আপাতত সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ সুদ নেওয়ার সুযোগ রাখা হবে। প্রতি মাস শেষে স্মার্ট রেট ঘোষণা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে আলোকে ব্যাংকগুলো সুদহার নির্ধারণ করবে। ট্রেজারি বিলের সুদ বাড়লে-কমলে তখন ফ্লোর রেট বাড়বে বা কমবে। বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার রয়েছে ৭ শতাংশের আশপাশে। এর মানে নতুন ব্যবস্থায় সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশের কাছাকাছিই থাকবে। ব্যাংক এর ওপরে সুদহারে যেতে পারবে না। চাইলে এর চেয়ে কম সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। এতে বেশ কিছু অগ্রগতি হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিতিশীলতা দূর করার ব্যবস্থা করা দরকার। অবশ্য এবারের মুদ্রানীতিতে ডলাররের একটা সিঙ্গেল রেট করার ঘোষণা আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ডলারের দাম বাজারভিত্তিক হলে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আকৃষ্ট করার জন্য প্রণোদনা বাড়ানো যেতে পারে। কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু নীতি সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করা যায়। এতে আমদানি নির্ভরতা কমে পণ্যমূল্যের দাম কমতে পারে। এই মুদ্রানীতিতে এটিও বহাল রাখা এবং কলেবর বাড়ানো যেতে পারে।

বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য বড় বড় ঋণখেলাপি গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করা। সিন্ডিকেট ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো যেভাবে কাজ করেছে, ঠিক একই পন্থায় বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি বিষয়গুলো আরও সহজ ও দ্রুত করা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমানোর জন্য গ্রাম পর্যায়ে ঋণ সুবিধা বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সেরা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। জানা গেছে, জাতীয় বাজেটের আলোকে মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ অর্জনের আশাবাদের কথা বলা হবে। দেখা যাক, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কেমন হয় এই সময়ের মুদ্রানীতি।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বইমেলায় রাশিদুল হাসানের ‘ওয়াকিং দ্য পাথ অব পোয়েট্রি’

শেষ সময়ে বই মেলার নিরাপত্তায় ঢিলেঢালা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল চান সাইফুল হক 

জাবির দুই শিক্ষার্থীর বহিষ্কারাদেশ বাতিলের দাবি

শিশু চুরির মামলায় দুই নারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

বিআরটিসি যেন আর পিছিয়ে না যায় : তাজুল ইসলাম

ঢাবির নাটমণ্ডলে মঞ্চায়িত হচ্ছে থিয়েটার বিভাগের নাটক ‘সিদ্ধান্ত’

টিআইবির ফেলোশিপ পেলেন সাংবাদিক সজিবুর রহমান

রংপুরে এরিক ও বিদিশার ওপর হামলার অভিযোগ

বইমেলার সময় বাড়ল

১০

রিহ্যাব নির্বাচনে ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নিরঙ্কুশ জয়

১১

৬ মাস বিশ্ববাজারে পেট্রোল বিক্রি করবে না রাশিয়া

১২

ফরিদপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ২০

১৩

গাধা বেচবে চিড়িয়াখানা

১৪

রাজধানীতে ৬ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা

১৫

হকিতে মেরিনার্স-আবাহনীর সহজ জয়

১৬

ভিনদেশের মোহ কেটেছে জামালের! 

১৭

পানগাঁও আইসিটিকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেওয়া যাবে না : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

১৮

বিপিএম পদকে ভূষিত হলেন মো. শাহ আলম

১৯

পুলিশের ৪০০ সদস্যকে পদক পরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী

২০
X