ওয়াগনার ভাড়াটে বাহিনীর প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের ভাগ্যে ঠিক কি ঘটেছে সে সম্পর্কে আমরা খুব সামান্যই জানি। আমরা শুধু এটুকুই জানি, প্রিগোজিন একটি বিমানে ছিলেন যেটি রাশিয়ার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় বিধ্বস্ত হয়েছে। ছোট সেই বিমানের যাত্রী তালিকায় ১০ জন আরোহীর মধ্যে প্রিগোজিনের নাম ছিল ।
বিমানটি মাটিতে পড়ার ভিডিও রয়েছে গণমাধ্যমের কাছে। তবে বিমানটি নাশকতার শিকার হয়েছে কিনা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি । তাছাড়া আমরা ক্রেমলিনে ঘটা কাকতালীয় ঘটনাগুলো সম্পর্কে অতি অল্পই জানি।
গত এক বছরে পুতিন সমালোচকদের অনেকেরই রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। পুতিন যাদের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন তাদের অপমৃত্যু যেন নিশ্চিত। কারো মৃত্যু হয়েছে বহুতল হাসপাতালের জানালা ভেঙ্গে নিচে রাস্তায় পড়ে, কারো মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়, আবার কারো মৃত্যু হয়েছে বিমান দূর্ঘটনায়। তাদের বেশিরভাগই ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছিলেন।
পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করার অনেক আগে রাশিয়ান ভিন্নমতাবলম্বী এবং পুতিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আলেক্সি নাভালনিকে ২০২০ সালে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। ক্রেমলিনের নির্দেশেই তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে সন্দেহ করেন অনেকেই। নাভালনি দীর্ঘদিন জার্মানির রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফিরে আসেন। তারপর রাশিয়ায় তাকে বন্দী করে রাখা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক রাশিয়ান গুপ্তচর আলেকজান্ডার লিটভিনেঙ্কোকেও চায়ের কাপে তেজস্ক্রিয় বিষ প্রয়োগ করেছিলেন পুতিন বা তার লোকেরা। মানবাধিকার আইনজীবী বরিস নেমতসভকে ক্রেমলিনের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
তারা সবাই ছিলেন কোনো না কোনো ভাবে পুতিনের সমালোচক। তাই প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় ইয়েভজেনি প্রিগোজিনও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
দুই মাস আগেই ইউক্রেনে যুদ্ধকালীন অবস্থাতেই ইয়েভজেনি প্রিগোজিন পুতিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা করেছিলেন। অবশ্য মস্কো পৌঁছানোর আগেই তিনি সেই বিদ্রোহ থেকে সরে আসেন। প্রিগোজিন সে সময়েই নিজেকে পুতিনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিলেন।
কেউ কেউ ভেবেছিলেন প্রিগোজিনের বিদ্রোহ ছিল ক্রেমলিনের ষড়যন্ত্রের অংশ। কিন্তু এটি এখন অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে। অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময়েই প্রিগোজিনের শেষের শুরু দেখেছি আমরা। অনেকেই সে সময় বলেছিলেন, প্রিগোজিনের আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম। পুতিনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার আগে অবশ্যই নিজের ভাগ্যের দিকে তাকানো উচিত বলে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
প্রিগোজিনের মৃত্যু ক্রেমলিনের সমালোচকদের উপর একটি শীতল প্রভাব ফেলবে। পুতিনের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছেন তাদের বেশিরভাগই এরই মধ্যে নিরব হয়ে গেছেন।
পুতিনের শেফের মৃত্যু ইউক্রেন যুদ্ধকে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা বুঝতে একটি ক্রিস্টাল বলের দিকে তাঁকানো যেতে পারে। অবশ্য ওয়াগনার ভাড়াটেরা সেখঅনে লড়াই করছে না। তারা বেলারুশ, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডের সীমান্তে সক্রিয় রয়েছে। অভ্যুত্থানের পরে প্রিগোজিনকে কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তা আমরা জানি না। বিদ্রোহের পর তাকে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করা হয়নি, তার পেছনে পুতিনের কূটচাল থাকতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রিগোজিনের সাম্রাজ্য কে দখল করবে? সারা বিশ্বজুড়ে ওয়াগনারের রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক, আছে সম্পদ ও ক্ষমতা। আফ্রিকা জুড়ে স্বৈরশাসকদের সাহায্য করতে অনেক খনি নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াগনার।
পুতিন কি আবার এক অলিগার্কের কাছে ওয়াগনার বাহিনীর সমস্ত ক্ষমতা দিতে চাইবেন? পুতিন কি আবার কাউকে বিশ্বাস করবেন? সেটা সময়ই বলে দেবে।
জেসন ফিল্ডস: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, নিউজউইক
ইংরেজী থেকে ভাষান্তর: মুজাহিদুল ইসলাম
মন্তব্য করুন