মাছুম বিল্লাহ
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪, ০৫:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

পেনশনের নতুন সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে

ছবি : প্রতীকী
ছবি : প্রতীকী

স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থায় আগামী জুলাই থেকে যোগ দেওয়া চাকুরেদের সর্বজনীন পেনশনে যুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তারা বিদ্যমান পেনশনের বদলে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির ‘প্রত্যয়’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সরকারের এ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সব নাগরিককে পেনশনের আওতায় আনতেই সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সার্বিকভাবে বৃহত্তর স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা থেকে সরে আসবেন বলে তিনি আশা করেন।

নতুন এ সিদ্ধান্তে স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুব্ধ হলেও চাকরির ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রয়েছেন সরব। তারা বলছেন, এ প্রজ্ঞাপন কার্যকর হলে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার হবেন। একই বেতন স্কেলের আওতাধীন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সরকারের ভিন্ন নীতি সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। তারা প্রয়োজনে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য আন্দোলনে যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমিতিগুলো এরই মধ্যে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আখতারুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের সম্মান করতেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে গেছেন। সেই শিক্ষকদের প্রদেয় সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হবে আর তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে, এটিই আমাদের জন্য লজ্জার।

৩০ জুনের পর আমাদের যে নতুন সহকর্মীরা আসবেন তারা জানবেন তারা কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। তাহলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় কেন আসবেন? ফেডারেশনের মহাসচিব অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভুঁইয়া বলেন, আমরা আমাদের জন্য কিছু করছি না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য, মেধাবীদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতায় ধরে রাখার জন্য কাজ করছি। তিনি বলেন, যে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। মেধাবীর এ পেশায় আসবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহেদ রানা বলেন, হঠাৎ করে এমন প্রজ্ঞাপনের ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন সম্পূর্ণ স্থিতিশীল।

পেনশন বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল করে তোলার পাঁয়তারা বলে মনে হচ্ছে। বিদ্যমান সরকারি পেনশন ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সর্বজনীন পেনশনের আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও। তিনি বলেছেন, ‘এর ফলে ভালো কিুছ হবে না। আমি বিষয়টি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে কথা বলব।’ হঠাৎ করেই এমন একটি বিজ্ঞাপন জারির ফলে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রজ্ঞাপন কার্যকর হলে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হবেন বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় পেনশন বিষয়ে দুটি বিজ্ঞাপন জারি করে। এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং এদের অধীন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে আগামী ১ জুলাই থেকে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকার পেনশন ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত করল। একই দিন সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা সংশোধন করে আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর ১ জুলাইয়ের পর থেকে ‘প্রত্যয়’ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক। বিদ্যমান প্রগতি, প্রবাস, সুরক্ষা ও সমতা- এই চার পেনশন কর্মসূচি ঐচ্ছিক হলেও নতুন স্কিম বাধ্যতামূলক। প্রত্যয় স্কিমে চাঁদার বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মূল বেতনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা- এ দুয়ের মধ্যে যেটি কম , সংশ্লিষ্ট সংস্থা তা চাকরিজীবীর বেতন থেকে কেটে রাখবে এবং সমপরিমাণ অর্থ সংস্থা দেবে। দুই অঙ্ক একত্রে চাকরিজীবীর পেনশন আইডির বিপরীতে সর্বজনীন পেনশন তহবিলে জমা করবে। যেদিন প্রতি মাসের বেতন দেওয়া হয়, তার পরের কর্মদিবসের মধ্যেই কাজটি করতে হবে। এ জমা অর্থের পরিমাণ ও মেয়াদের ভিত্তিতে অবসরকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পেনশন ভোগ করবেন।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা সংশোধন করে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে তা প্রায় ৪০০ সংস্থার ওপর কার্যকর হবে। যে-সব সংস্থা ৫০ শতাংশের বেশি সরকারি অর্থায়নে চলে, সেগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আর স্বশাসিত বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বোঝানো হয়েছে সেগুলোকে যারা কোনো আইনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কোনো কর্তৃপক্ষ, করপোরেশন, কমিশন, সংস্থা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউশন, কাউন্সিল, একাডেমি, ট্রাস্ট, বোর্ড, ফাউন্ডেশন ইত্যাদি রয়েছে। বাংলা একাডেমি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডও এই তালিকায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ১৪ লাখের বেশি কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায় যে, দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে পেনশনের আওতায় আনতে গত আগস্টে চালু করা হয় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি। তখন চার শ্রেণির মানুষের জন্য চারটি স্কিম চালু করা হয়। সে সময় একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, সুবিধামতো সময়ে সরকার আরও দুটি স্কিম চালু করে স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসবে। সেই ধারাবাহিকতায় এই সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তে আসার আগে এ সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান পেনশন সুবিধা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন কমিশন ও করপোরেশন সরকারি কর্মচারীদের আদলেই পেনশন দেওয়া হয় যা এ ধরনের মোট প্রতিষ্ঠানের ২৫ শতাংশের বেশি নয়। এর বাইরে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রদেয় ভবিষ্য তহবিলের মাধ্যমে মাধ্যমে অবসর সুবিধা দেওয়া হয়। এ তহবিলে চাকরিজীবীরা তাদের মূল বেতনের ১০ শতাংশ জমা দেন, আর সংস্থা দেয় ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

অবসরের পর এ টাকা এবং এর বাইরে প্রতিবছর দুই মাসের মূল বেতনের সমান আনুতোষিক অর্থাৎ গ্রাচুইটি তারা পান। আবার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে প্রদেয় ভবিষ্য তহবিলও নেই। এ ক্ষেত্রে অবসরের পর চাকরিজীবীরা শুধু গ্রাচুইটি পেয়ে থাকে। তবে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সবাইকে পেনশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটিকে তো পজিটিভই মনে হয়। তবে, মানুষের একটি ভয় থেকে যায় যে, সরকারের অনেক মহতী উদ্যোগই নাগরিকদের সুবিধা দিতে পারে না অসাধু, লোভী এবং দেশপ্রেমহীন অনেক কর্মকর্তা ও পলিসি মেকারদের কারণে। সেই বিষয়টি যদি নিশ্চিত করা যায় অর্থাৎ এখানে পরিবর্তন অবশ্যই আনা অবশ্যই প্রয়োজন সেটি করা গেলে এই উদ্যোগকে একটি কলাণ্যকার ও শুভ বলা যায়।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর- ভলান্টিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ভাব)

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্বাস্থ্য পরামর্শ / মোটরযানের কালো ধোঁয়া ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি

নুরের ওপর হামলার নিন্দা / আমরা অত্যন্ত নাজুক সময়ে আছি : তারেক রহমান

নুরের অবস্থা মুমূর্ষু, বাঁচবে কি মরবে জানি না : রাশেদ

নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে নিজ উপজেলায় বিক্ষোভ

ডাচদের সাথে লিটনদের লড়াই দেখবেন যেভাবে

নুরের ওপর হামলা / ঢাকা-ময়মসিংসহ সড়ক অবরোধ

কী বলে নুরের ওপর হামলা করা হয়, জানালেন ইয়ামিন মোল্লা

আফগানদের হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে শুভ সূচনা পাকিস্তানের

নুরের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতি

আইসিইউতে নুর, ৪৮ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবে না : চিকিৎসক

১০

নুরের ওপর হামলা ‘অত্যন্ত ন্যক্কারজনক’: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব

১১

নুরের ওপর হামলায় ১০১ সংগঠনের বিবৃতি

১২

নুরকে দেখতে এসে আসিফ নজরুল অবরুদ্ধ 

১৩

আহত নুরকে দেখতে ঢামেকে প্রেস সচিব

১৪

সহিংসতার ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি

১৫

সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি : হাসনাত

১৬

মাদুশঙ্কার হ্যাটট্রিকে লঙ্কানদের রুদ্ধশ্বাস জয়

১৭

নুরের ওপর হামলার কড়া প্রতিবাদ ছাত্রদলের

১৮

ভারতীয় বক্সারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হাসান শিকদার

১৯

আসিফ নজরুলকে তুলোধুনো করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

২০
X