

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ভোটের দিন ফজরের ওয়াক্তে গিয়ে ওখানে (ভোটকেন্দ্রে) ফজরের জামাত আদায় করতে হবে। যাতে করে ১৬ বছর ধরে যেভাবে নিশিরাতে নির্বাচন হয়েছে, আমরা এবার আর করতে দেব না। ১৬ বছর ধরে যেমন আমু-ডামু নির্বাচন হয়েছে, আমরা এবার করতে দেব না। এবার হচ্ছে জনগণের পালা, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা কী করবে।’ শুক্রবার রাতে রংপুর নগরীর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সব ধর্মের ভোটারদের ভোরবেলা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে। যাতে কেউ কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই রংপুর হচ্ছে আবু সাঈদের পবিত্র রক্ত মেশানো মাটি। যে ত্যাগ আমরা জুলাইয়ে দেখেছি, সেটা কখনো বৃথা যেতে পারে না। আমাদের যে কোনোভাবে সেটা আগে মূল্যায়ন করতে হবে। আবু সাঈদসহ যে ১ হাজার ৪০০ জন ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন, তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন আমরা তখনই করতে পারব, যখন এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘অনেক মানুষ বলে, রংপুর হলো গরিব অঞ্চল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, এই অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক নেতৃত্ব ও সঠিক ব্যক্তি। তাহলেই আমরা এই বিভাগের আমূল পরিবর্তন করতে পারব।’
বিএনপির আমলে এ অঞ্চলের মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছিল—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে তথাকথিত উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে, কিন্তু মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সঠিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় টিকে থাকার জন্য নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য, মিল, কলকারখানা—এখানে কিছুই করা হয়নি।’
তারেক রহমান বলেন, ‘একটু আগে আমি আবু সাঈদের বাড়ি থেকে এলাম। আমি জানতাম না সেখানেও পর্যন্ত কয়লা আছে। আমি জানতাম দিনাজপুরে কয়লা আছে। কিন্তু আজ শুনলাম, সেখানে কয়লা আছে। এই কয়লা যদি আমরা উত্তোলন করতে পারি, তাহলে আমরা অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চল হচ্ছে কৃষিপ্রধান অঞ্চল, এলাকার বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। এজন্যই আমরা দেখেছি, বিগত ১৬ বছরে সমাজের অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি কৃষক ভাইয়েরা কীভাবে নির্যাতিত হয়েছে। কৃষিজাত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অভাবে কৃষকদের কষ্টের শিকার হতে হয়েছে।’
সরকার গঠন করলে কৃষকদের কৃষিঋণ ও এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ মওকুফের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিসাব-নিকাশ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি—আপনাদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে যাদের কৃষিঋণ বর্তমানে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে। সারা দেশের কৃষকদের কৃষিঋণ ১০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কষ্টে থাকার কারণে এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করে থাকে। বিএনপি সরকার গঠন করলে এসব ক্ষুদ্রঋণ সরকারের পক্ষ থেকে এনজিওগুলোকে পরিশোধ করা হবে। ফলে এই অঞ্চলের মানুষকে আর সেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে না।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এই অঞ্চলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে এখানকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। এই অঞ্চলে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিপুল কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনা। বাংলাদেশের খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা অঞ্চল যদি শিল্পবেল্ট হতে পারে, তবে রংপুর বিভাগসহ রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও এলাকায় কেন কৃষিজাত পণ্যের শিল্প গড়ে উঠবে না—সে প্রশ্ন রাখছি।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষিজাত পণ্যভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা এই অঞ্চলে এসে মিল ও কারখানা স্থাপন করেন। এর ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ-যুবক আইটি খাতে কাজ করছেন। আইটি কোম্পানিগুলো যদি এই অঞ্চলে এসে তাদের কোম্পানি স্থাপন করে এবং স্থানীয় দক্ষ জনশক্তিকে চাকরির সুযোগ দেয়, তবে সেই সব কোম্পানিকে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত কর ছাড় দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শহীদ আবু সাঈদের স্বপ্নের একটি অংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বড় যে কাজটি বাকি থাকবে, সেটি হলো—এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনা। আমরা একা এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে পারব না। কারণ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে পরিবর্তন হয়েছিল, তা কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা হয়নি। নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে হয়নি। এ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল বলেই সেদিন সেই পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল।’
জুলাইয়ের পরিবর্তন ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণকে সামনের কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। সামনের কাতারে দাঁড়ানোর অর্থ হলো—নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করতে হবে। এজন্য দেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যে নির্বাচন হচ্ছে, এতে আপনাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে আপনারা সঠিক ব্যক্তিকে নির্বাচন করবেন—যারা আপনার এই এলাকার উন্নয়ন করবে।’
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সুবিধার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের যদি অর্থনৈতিক অংশীদার না করি, তাহলে কোনোভাবে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। নারী সমাজকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য একটি কার্ড তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক গৃহিণী বা প্রত্যেক মায়ের কাছে একটা করে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে আমরা সহযোগিতা পৌঁছে দিতে চাই, যাতে তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে এবং অর্থনীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘কৃষকদের কাছে আমরা একইভাবে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেব। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে জমির পরিমাণ অনুযায়ী একটি ফসলের সম্পূর্ণ বীজ, সার ও কীটনাশক তুলে দিতে চাই। যাতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমে এবং তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।’
এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলুসহ রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১২টায় তিনি বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। সেখানে তারেক রহমান বলেন, ‘এই নির্বাচন শুধু নির্বাচন নয়, এই নির্বাচনটি নিশ্চিত করবে আগামী দিনে এই দেশের মানুষের জবাবদিহিমূলক সরকার তৈরি হবে কি না। এই নির্বাচন আমাদের দিকনির্দেশনা দেবে—দেশ কোন পথে পরিচালিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের দেশকে প্রত্যাশিত, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। এজন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বগুড়া শুধু বঞ্চিত ছিল না গত ১৫ বছর ধরে। বলা যায়, সমগ্র বাংলাদেশ বঞ্চিত ছিল। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষাব্যবস্থা—সবকিছুই ধ্বংস হয়েছে।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি রাজশাহীর হজরত শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন এবং ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় তিনি নওগাঁয় সমাবেশে ভাষণ দিয়ে রাতে বগুড়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথে পথে তাকে অভ্যর্থনা জানায় হাজারো মানুষ। জনস্রোতের কারণে তাকে বহনকারী গাড়িবহর ধীরগতিতে চলতে বাধ্য হয়।
রাত ১১টা ৫০ মিনিটে তিনি বগুড়ায় পৌঁছালে আলতাফুন্নেছা মাঠে তাকে স্বাগত জানান হাজারো নেতাকর্মী। সভা শুরুর আগে তার প্রয়াত মা বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া পরিচালনা করেন মুফতি আতাউল্লাহ নিজামী।
পরদিন শুক্রবার সকালে তারেক রহমান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের জন্য হুইলচেয়ার বিতরণ করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। শিশু-কিশোররা গান ও কবিতা পরিবেশন করে। তারেক রহমান বলেন, ‘এই শিশুদের আমরা ঘরে বন্দি করে রাখি, সমাজে অবহেলা করি। অথচ এরা অত্যন্ত প্রতিভাবান। আমাদের উচিত তাদের ভবিষ্যৎ দেশগড়ার কাজে সম্পৃক্ত করা।’
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘তাদের প্রতিভা দেখে আমি অভিভূত। আমরা তাদের পাশে আছি এবং থাকব। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা আধুনিক দেশ গড়তে চাই।’
শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করেন বগুড়া বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদে। নামাজ শেষে তিনি বলেন, ‘এই মসজিদের কাজ আমি শুরু করেছিলাম; কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় শেষ করতে পারিনি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এটিকে আধুনিক মসজিদে পরিণত করব।’
এরপর দুপুরে তিনি হজরত শাহ সুলতান বলখীর (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। সেখানে দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য দোয়া করেন। বিকেল ৩টায় বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বাসস্ট্যান্ডে বিশাল পথসভায় তিনি বলেন, ‘ধানের শীষ যতবারই জনগণের ভোটে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে, ততবারই দেশ ও এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছে। প্রিয় মোকামতলাবাসী, আমরা আবারও আপনাদের এলাকার উন্নয়ন করতে চাই। এজন্য ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে প্রমাণ করুন—বগুড়ার মাটি বিএনপির ঘাঁটি।’
পথসভায় বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মীর শাহে আলম বলেন, ‘শিবগঞ্জবাসীর ন্যায্য অধিকার আদায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।’
সভায় শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাব, সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, সিনিয়র সহসভাপতি মাহবুব আলম মানিকসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সাধারণ মানুষ, তরুণ-তরুণী ও প্রবীণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সভাস্থল ও আশপাশের এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কেউ বলেন, ধানের শীষ আমাদের শান্তির প্রতীক; কেউ বলেন আমরা পরিবর্তন চাই, উন্নয়ন চাই, ভোট দিতে চাই। সভা শেষে জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেন তারেক রহমান।
মন্তব্য করুন