

আসন্ন পবিত্র রমজান কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত হয়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের বিশাল সরবরাহ এবং এলসি (ঋণপত্র) খোলার শর্ত শিথিল হওয়ার ইতিবাচক প্রভাবে এবারের রমজানে বাজারদর স্থিতিশীল থাকার জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পণ্যের দামে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানিকৃত পণ্যের বর্তমান প্রবাহ এবং সরকারি তদারকি বৃদ্ধি পেলে সাধারণ ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাবেন। বিশেষ করে চিনির বাজার পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে এলসি খোলার শর্ত শিথিল হওয়া। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে রমজান সামনে রেখে যেখানে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিয়ে এলসি খুলতে হতো, সেখানে এবার মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ মার্জিনে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সহজ শর্তের কারণে দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও সরাসরি আমদানিতে অংশ নিতে পেরেছেন। ফলে বাজারে নির্দিষ্ট কোনো বড় গ্রুপের একক আধিপত্য কমেছে এবং সার্বিক সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে ডলারের মজুত বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোও ঋণপত্র খুলতে আগ্রহী হচ্ছে, যা আমদানির প্রবাহকে নিরবচ্ছিন্ন রেখেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে বর্তমানে কোনো বড় সংকট নেই। চিনি, ছোলা ও গমের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে।’ তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পামঅয়েল ও সয়াবিন তেলের বুকিং দর বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোজ্যতেলের দামে কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেল থেকে বায়ো-ডিজেল উৎপাদনের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক পামঅয়েলের এক্সপোর্ট লেভি ও রেফারেন্স প্রাইস বাড়ানোর ফলে মালয়েশিয়ান পামঅয়েলের বাজার চড়া রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা স্পষ্ট করেছেন, এই অস্থিরতার পেছনে স্থানীয় কোনো সংকট নেই, বরং এটি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিফলন।
গত বছর চিনির দাম প্রতি মণে যেখানে ৫ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, বর্তমানে পাইকারি বাজারে তা ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশীয় মিলগুলো থেকে নিয়মিত সরবরাহ অব্যাহত থাকায় চিনির বাজারে কোনো অস্থিরতা নেই। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে ফিনিশ সুগার আমদানি নিয়ন্ত্রিত থাকলেও স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে।
অন্যদিকে, রমজানের অন্যতম প্রধান ভোগ্যপণ্য ছোলার পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও বন্দরে পণ্য খালাসে ধীরগতির কারণে পাইকারি বাজারে দাম কিছুটা বাড়তির দিকে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানান, আমদানিকৃত ছোলা বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে। সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক থাকলে এ দাম কমে আসবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বিপুল পরিমাণ তেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও গম নিয়ে প্রায় ১৩৪টি মাদার ভেসেল এবং ৭২০টি লাইটার জাহাজ অপেক্ষায় আছে। সাগরে এই বিশাল পণ্য সরবরাহ কার্যত ‘ভাসমান গুদামে’ পরিণত হয়েছে। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, অনেক আমদানিকারক ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য খালাসে ধীরগতি দেখাচ্ছেন। এতে একদিকে বন্দরের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে প্রতিটি বড় জাহাজকে প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের এই বাড়তি খরচ পণ্যের বাজারদরের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এমন পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তর বড় ছয়টি আমদানিকারক গ্রুপসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশ দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরের এই জাহাজজট নিরসন হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি দাম নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং কৃত্রিম সংকট রোধে সরকারি নজরদারি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন লাইটারেজ জাহাজ সংকট নিরসন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুত প্রবণতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারি সংস্থাগুলোর নিবিড় তদারকি এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে আমদানিকৃত এই বিশাল মজুতের সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাবেন এবং এবারের রমজানজুড়ে বাজার পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে।
মন্তব্য করুন