একদফা দাবিতে চূড়ান্ত ধাপের আন্দোলনের শুরুতে ঢাকায় মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নানামুখী চাপে পড়েছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বর্তমানে বিএনপি যতটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সাম্প্রতিক অতীতে এতটা কঠিন সময় তারা পার করেনি। দলটির প্রধান কার্যালয় তালাবদ্ধ, চলছে গণগ্রেপ্তার। পলাতক অবস্থায় রয়েছেন নেতাকর্মীরা। এতে করে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্র নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। পুরো দল কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
তবে এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও অবশ্য আশা দেখছে বিএনপি। দলটির দাবি, জনগণের সমর্থনে হরতাল এবং সদ্য শেষ হওয়া অবরোধ কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হয়েছে। তারা মনে করছে, দাবি আদায়ে তাদের টানা কর্মসূচি দিতে অনুপ্রাণিত করছে। আন্দোলন সফল হবে, সেই আশায় আগামীকাল রোববার সকাল থেকে দেশব্যাপী ফের ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে দলটি। এই কর্মসূচি আরও কঠোরভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাইকমান্ড। বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই অবরোধ আরও বাড়বে। তবে বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আগামী ৭ নভেম্বর (মঙ্গলবার) দলটির কোনো কর্মসূচি থাকছে না। এরপর বুধ ও বৃহস্পতিবার ফের হরতাল কিংবা অবরোধের কর্মসূচি আসতে পারে। এই কর্মসূচি আগামী সপ্তাহেও গড়াতে পারে। তখন সপ্তাহজুড়ে দেওয়া হতে পারে টানা অবরোধের ডাক। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তপশিলের আগেই চলমান আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে চায় বিএনপির হাইকমান্ড।
সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের একদফা দাবিতে চূড়ান্ত ধাপের আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছিল বিএনপি। দলীয় সূত্র দাবি করছে, কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে—সারা দেশের নেতাকর্মীদের কাছে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে এমন নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত ওই মহাসমাবেশ আগেই শেষ হয়ে যায়। বিএনপির দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হতে দেয়নি এবং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। এর প্রতিবাদে গত রোববার যুগপৎভাবে দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে দলটি। হরতাল কর্মসূচি শেষে যুগপৎভাবে মঙ্গলবার থেকে দেশব্যাপী টানা ৭২ ঘণ্টা অবরোধের কর্মসূচি পালন করা হয়। মহাসমাবেশে হামলা, নেতাকর্মীদের হত্যা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আন্দোলনরত বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং সরকারের পদত্যাগের একদফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে এই অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
বিএনপির দাবি, জনগণের সমর্থনে দীর্ঘদিন পর নজিরবিহীন হরতাল পালিত হয়েছে। অবরোধের কর্মসূচিতেও জনগণ ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। সে কারণে সরকারের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সড়কপথে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন চলেনি। ঢাকার ভেতরেও সাধারণ মানুষ সরকারের প্রতি অনাস্থা দিয়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হয়নি। এ ছাড়া ধরপাকড়ের মধ্যেও নেতাকর্মীরা মাঠে রয়েছেন। সারা দেশে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেছে তারা। বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতেও এই বিষয়টি আন্দোলন সফলে দলটিকে আশাবাদী করে তুলেছে। বিএনপির কিছু কিছু নেতা বলছেন, হরতাল-অবরোধের কর্মসূচিতে তারা যে সাড়া পেয়েছেন, তাতে আশাবাদী যে, অচিরেই আন্দোলনের ফল ঘরে তুলতে পারবেন।
এদিকে চলমান আন্দোলন দমাতে সরকার গণগ্রেপ্তার করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। যদিও সংঘর্ষের ঘটনার পর যে ক্র্যাকডাউন চলছে এবং এটি যে কঠোর হবে, এ ব্যাপারে ধারণা ছিল দলটির। বিএনপির তথ্যানুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ এবং মহাসমাবেশের পর হরতাল-অবরোধ কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত ১০৭টির অধিক মামলায় ৪ হাজার ৮৪৭ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১টি মামলায় ২৯২ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হকসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তারের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে এখন আন্দোলনের সার্বিক বিষয় মনিটরিং করা হচ্ছে। ফলে শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা গ্রেপ্তার হলেও চলমান আন্দোলনে কোনো ছন্দপতন হবে না বলে দাবি দলটির নেতাদের।
জানা গেছে, আন্দোলন এগিয়ে নিতে নেতাকর্মীদের সর্বতোভাবে গ্রেপ্তার এড়িয়ে কর্মসূচি সফলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারপরও যারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাদের স্থলে কমিটির পরবর্তী জনকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সেটিকে আন্দোলনের পথে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বিএনপি। দলটির দাবি, সহিংসতার ঘটনার দায় বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা হলেও প্রকৃত ঘটনা বিদেশিদের কাছে ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে। বিএনপির মহাসমাবেশে হামলার ঘটনায় সরকার ও পুলিশকে দায়ী করে গত সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ঢাকাস্থ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চিঠি দিয়েছে দলটি। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব বাংলাদেশে আগামীতে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছে। বিএনপির অভিযোগ, তাদের বাইরে রেখে আবারও একটি একতরফা নির্বাচনের চিন্তা করছে সরকার। তবে আবার এমন নির্বাচন হলে সেটিকে আন্তর্জাতিক বিশ্ব অনুমোদন দেবে না বলে দাবি দলটির নেতাদের।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান দৈনিক কালবেলাকে বলেন, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অটল রয়েছি। দাবি আদায়ে রাজপথে ছিলাম, রাজপথে আছি। জুলুম-নির্যাতন, মিথ্যা মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার করে এ দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে নস্যাৎ করা যাবে না। তিনি বলেন, সরকার পতনের একদফা দাবিতে যে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে, তা অব্যাহত থাকবে। বিএনপির প্রতিটি কর্মীই নেতার ভূমিকা পালন করে এ আন্দোলনে সফলতা আনবে।
মঈন খান বলেন, সরকার গণদাবিকে কোনোরকম তোয়াক্কা না করে সংবিধানের দোহাই দিয়ে আবারও একদলীয় সাজানো নির্বাচন করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাচ্ছে। আর এর বিরুদ্ধে দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, সরকার আমাদের দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিগুলোতে উসকানি দিয়ে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানোর ফন্দি নিয়েছে। এসব ধাপ্পাবাজি দিয়ে এবার দেশে-বিদেশে কাউকে আর বিভ্রান্ত করা যাবে না।