রমজানে ইফতার, তারাবি ও সেহরির সময় বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক থাকবে বলা হলেও কার্যত রমজানের প্রথম দিন থেকেই সারা দেশে লোডশেডিং হচ্ছে। দিন দিন গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোডশেডিংও বাড়ছে। এ অবস্থায় গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, শিল্প-কারখানার উৎপাদন, সার উৎপাদন ঠিক রাখা, বাণিজ্যিকে সরবরাহ ঠিক রাখতে বিশ্ববাজারের স্পট মার্কেট থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম সর্বনিম্ন। এই কম দামের সুযোগ নিতে চাইছে সরকার। এ জন্য স্পট মার্কেট থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইনভেস্টিগেটিং ডটকম (জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান) ও রয়টার্সের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম পৌনে ৮ ডলার থেকে সাড়ে ৮ ডলার। এর আগে ২০২১ সালে এমএমবিটিইউ প্রতি দাম নেমেছিল ৭ দশমিক ৬০ ডলারে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, আগামী মাস থেকে গ্যাসের সরবরাহ ক্রমান্বয়ে বাড়বে। আশা করছি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমরা একটি পরিকল্পনা করেছি, সে মোতাবেক এগোচ্ছি।
জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সপ্তাহ দু-একের মধ্যে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ শেষে চালু হবে। এটি চালু হলে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে।
পাশাপাশি এখন বিশ্ব স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম কম থাকায় আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার সূত্র জানায়, এখন আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজি যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে এ বছর প্রায় দ্বিগুণ বেশি কেনা হবে। এ সময় স্পট মার্কেট থেকে ৪৮-৪৯টি কার্গো কেনার পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার। গত বছর কেনা হয়েছিল ২৫টি কার্গো। সে হিসাবে এ বছর ২৩টি কার্গো বেশি কেনা হবে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এপ্রিলে পাঁচটি কার্গো আমদানি করা হবে। এর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সাতটি কার্গো আমদানি করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী কামরুজ্জামান খান বলেন, এ বছর আমরা বেশি কার্গো কেনার পরিকল্পনা করেছি। গত বছরের চেয়ে এবার বেশি কেনা হবে। আগে ২৫টি ছিল, এখন সেটি ৪৯টি করা হয়েছে। দাম নিম্নমুখী থাকলে ২০২৪ সালে এ পরিমাণ এলএনজি কার্গো কেনা হতে পারে। তবে এ জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
জানা যায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ১৪ ডলারে উঠে যায়। ২০২২ সালের আগস্টে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম উঠে আসে ৫৫ ডলারে। দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির কারণে ওই বছরের মাঝামাঝি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেয় জ্বালানি বিভাগ। ওই সময় টানা ছয়-সাত মাস আমদানি বন্ধ থাকে। তখন দেশে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানিটির দাম নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ফলে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবারও স্পট মার্কেট থেকে আমদানি শুরু করে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে বাজারদর ৯ থেকে সাড়ে ৯ ডলারে ওঠানামা করেছে। বর্তমানে তা সাড়ে ৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাসের চিত্র থেকে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে চাহিদা বিপরীতে ২ হাজার ৬৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজির পরিমাণ ৬৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
এদিকে, সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগে গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে এক বৈঠকে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান জানান, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়ে ৩ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুট করা হবে। বিদ্যুৎ, শিল্প ও সব ধরনের কারখানায় যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায় এ জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই বৈঠকে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে একটি পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক ১ হাজার ২৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হবে। সেচের বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হবে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, অনগ্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্রে এক হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অফগ্রিড বিদ্যুৎকেন্দ্রে দৈনিক ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
এ ছাড়া সার কারখানায় দৈনিক ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ৬৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট, শিল্পে ৬৯২ মিলিয়ন ঘনফুট, আবাসিকে ২৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট, সিএনজিতে ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট, বাণিজ্যিকে ১৫ এবং চা বাগানে এক মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানায়, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট হবে। এ জন্য বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলার কাছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ১৪শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চেয়েছিল। তবে পেট্রোবাংলা ১ হাজার ২৯০ মিলিয়ন সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেইন বলেন, গ্রীষ্মের চাহিদা সামাল দেওয়ার জন্য এলএনজি আমদানির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কোন কোন কোম্পানির কাছ থেকে এলএনজি আনা হবে, কার্গোগুলো কবে আসবে, তাও ঠিক করা হয়েছে। সংগত কারণে এবার বিদ্যুতের জন্য গ্যাসের কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করছি।