

দেশের ইতিহাসে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে প্রথম থেকেই আলোচনায় নানামুখী চ্যালেঞ্জ। দুই সপ্তাহ সময়ও হাতে নেই, এখনো সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্ভব হবে কি না—এমন শঙ্কা দূর হচ্ছে না। কেননা দিন যত ঘনিয়ে আসছে, উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নির্বাচনী মাঠ। ঘটছে হতাহতের ঘটনা। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আট দিনে অন্তত অর্ধশত সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নির্বাচনের আগে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে। বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জনমনে ভোট নিয়ে ভীতি তৈরি করার চেষ্টা করা হতে পারে। একই প্রতিবেদনে ‘টার্গেট কিলিং’ নিয়েও শঙ্কার কথা বলা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের।
শুক্রবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একাধিক প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১১ জানুয়ারি নির্বাচনী তপশিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১৪৬টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) গত অক্টোবর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার তথ্য দিয়ে বলছে, জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে সারা দেশে ৯৮১টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। গত বুধবার শেরপুরে সংঘর্ষে নিহত হন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। এ ছাড়া তপশিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনা রয়েছে।
আমরা প্রত্যক্ষ করছি, অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ থাকার বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ইসি, প্রশাসন ও খোদ সরকারের উচ্চমহল থেকে বারবার ব্যক্ত করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকেই যাচ্ছে। স্বভাবতই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচন প্রচারকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যতটা কঠোর হওয়া দরকার, তাতে তারা ব্যর্থ। ফলে নির্বাচন যখন দোরগোড়ায়, তখন পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার বিষয়টি চিন্তার বটে।
আমরা মনে করি, দীর্ঘ সময় পর দেশের মানুষের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা সফল করার ক্ষেত্রে সব ধরনের যথাযথ প্রস্তুতি আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে কোনোরকম শৈথিল্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা এবং টার্গেট কিলিংয়ের যে প্রতিবেদন গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে যত সম্ভব জোরদার জরুরি। কারণ, হাতে সময় একদম কম। একই সময় মনে রাখতে হবে, শুধু ইসি প্রশাসন কিংবা সরকার একটি উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় দায়িত্ব রয়েছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া ভালো নির্বাচন অসম্ভব। এ ছাড়া এবার নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে এআই চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সংঘাত-সহিংসতায় কাজ করছে এর অপব্যবহার। ফলে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রযুক্তির এ চ্যালেঞ্জ রুখতে হবে। নইলে বহু উচ্চারিত ইতিহাসের ‘সেরা নির্বাচন’ অনুষ্ঠান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, পরিস্থিতি যেন আরও খারাপের দিকে না যায়, এজন্য দ্রুত কঠোর ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন