

মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন বাঙালি লোকসংগীত, লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও লোকসাহিত্য বিশারদ। একটা জাতি বা সমাজের সার্বিক জীবনধারার বিচিত্র প্রকাশই সংস্কৃতি। আর এ সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি লোকজ জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি নিখুঁত চিত্র; যেখানে জীবনের হাসি-কান্না, গৌরবগাথা ও সুখ-দুঃখের বিচিত্র প্রকাশ ঘটে সাহিত্য হিসেবে, যাকে আমরা লোকসাহিত্য বলি। লোকসাহিত্য নিয়ে যিনি গবেষণা করেন তিনি লোকবিজ্ঞানী। সেরকমই একজন লোকবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন। তিনি ১৯০৪ সালের ৩১ জানুয়ারি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার মুরারীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন ১৯২১ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২৬ সালে বিএ পাস করেন। ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডিয়ান ভার্নাকুলার্সে প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করে এমএ পাস করেন। তার আগে আর কোনো মুসলিম ছাত্র প্রথম শ্রেণি পাননি। অল্প বয়সে লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। লোকসাহিত্য সংগ্রহে তার আত্মনিবেদন ঘটে ‘প্রবাসী’ পত্রিকা পাঠে। পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো এবং সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগৃহীত লালনের গান ছাপা হয়, যা কিশোর কবি হিসেবে তাকে লালনের গান সংগ্রহে অনুপ্রেরণা জোগায়। পরবর্তী সময়ে প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। আহমদ শরীফের ভাষায়, নবযৌবনে রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য ও অবনীন্দ্রনাথের আদরপুষ্ট হয়েছিলেন তিনি। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৩১ সালে সরকারি চাকরি দিয়ে। বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনার পর চাকরি শেষ করেন ১৯৫৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রফেসর হিসেবে। ১৯৫২ সালে সরকারি মাসিক পত্রিকা ‘মাহে নও’-এর সম্পাদক ছিলেন ছয় মাসের জন্য। নিজ গ্রাম পাবনার মুরারীপুরের প্রেমদাস বৈরাগীর কাছ থেকে প্রথম সংগৃহীত লালনের একটি গান পাঠিয়ে দেন প্রবাসীতে। এটি ছাপা হয় ১৩৩০ সালের আশ্বিন সংখ্যায়। তার মাধ্যমে আমরা পেয়েছি ত্রয়োদশ খণ্ডে ‘হারামণি’র মতো লোকসংগীতের অমূল্য সংগ্রহ। এ ছাড়া বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনার মতো তিন খণ্ডে বিভক্ত গবেষণাগ্রন্থ। তার মোট গ্রন্থসংখ্যা ৪২টি। অমূল্য সব কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশে পেয়েছেন অনন্য সব সম্মান, স্বীকৃতি, সংবর্ধনা, পদক। তার জীবনের কয়েক দশক কাটিয়েছেন রাজধানী ঢাকাতেই। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন ছিলেন এক বিশ্বমানব। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে তার ছিল নিবিড় যোগাযোগ। তাকে নিয়ে প্রয়াত কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছেন: যে-গভীর সত্যবাণী নিরক্ষর গীতিকার কবিদের/ ঠোঁটে ঠোঁটে কেঁদে উঠেছিলো—/ তাকে তুমি ছড়ালে নিখিলে। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৬৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি শিক্ষায় অবদানের জন্য ১৯৭৬ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।
মন্তব্য করুন