সালেমা আমজাদ। নামের মতো তার চেহারাতেও আভিজাত্যের ছাপ। অনর্গল কথা বলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশি বাবার ঘরে জন্ম নিয়েছেন লন্ডনে। আদর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা সালেমার বিয়ে হয়েছে লন্ডনেই। সেই সংসারে তার ৪ ছেলে মেয়ে। পরম মমতা আর ভালোবাসায় বড় করেছেন সন্তানদের।
কিন্তু ৭০ বছর বয়সী সালেমার সন্তানেরা ভুলে গেছে মায়ের সারাজীবনের বিলিয়ে দেওয়া ভালোবাসাকে। বাবার মৃত্যুর পর জন্মদাত্রী মাকে এতটাই বোঝা মনে হয়েছে তাদের কাছে। একটি কাপড়ের ব্যাগ হাতে ধরিয়ে তুলে দিয়েছিল বাংলাদেশের বিমানে। ঢাকার বিমানবন্দরে নেমে কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না তার।
রাস্তায় ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে হাত পেতে কখনো রুটি কলা, কখনো ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে বেঁচেছিলেন তিনি। বিদেশের বিলাসী জীবনে বেড়ে ওঠা সালেমা বৃদ্ধ বয়সে পড়ে ছিলেন ঢাকার সড়কে। সেখানে থেকেই তাকে তুলে নিয়ে আসে ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’। তার ঠাঁই হয় কল্যাণপুরের বৃদ্ধাশ্রমে।
সদাহাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও অসম্ভব মেধাবী বৃদ্ধা মা সালেমা আমজাদ আপন করে নিয়েছিলেন ওই বৃদ্ধাশ্রমের সকলকেই। তাই ভালোবেসে তাকে সবাই লন্ডনী মা বলে ডাকতেন।
দীর্ঘ আট বছর বৃদ্ধা মা সালেমা আমজাদ চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারে বসবাস করেছেন। কিছু দিন আগে এক রাতের খাবার শেষে বিছানায় শুয়ে পড়েন তিনি। আর উঠতে পারেননি বিছানা থেকে। সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লন্ডনি মা।
ছোটবেলায় যে সন্তানদের পরম মমতা, ভালোবাসায় বুকে আগলে বড় করেছেন তারা কেউই পাশে ছিল না তার বিদায় বেলায়।
বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক মিল্টন সমাদ্দার কালবেলাকে বলেন, ‘লন্ডনি মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল সাভারে যেন তার মাটি হয়। সেই অনুযায়ী সেখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে।’
শিক্ষকরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। বাবা-মায়ের পর একজন শিক্ষকই পারেন কোনো শিশুকে ভালোবেসে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে। প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীই একজন শিক্ষকের কাছে সন্তানতুল্য।
তেমনি একজন শিক্ষক ছিলেন চট্টগ্রামের সেলিম মাস্টার। ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। পড়িয়েছেন শত শত ছাত্রছাত্রীকে। তারা কেউ এখন চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার বা সমাজের বড় বড় জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বৃদ্ধ শিক্ষক সেলিম মাস্টারের ভালোবাসা, শাসন হয়তোবা মনে নেই অনেকেরই। খোঁজ রাখেনি কোনো ছাত্র।
অবসরের পর পেনশনের টাকা তুলে দিয়েছিলেন নিজের দুই মেয়ের হাতে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সেই মেয়েরা তাকে বসিয়ে রেখে গেছেন চট্টগ্রামের একটি মাজারের গেটে। যে বাবা রক্ত ঘাম করা টাকায় পড়াশোনা করিয়েছেন দুই মেয়েকে। বুকের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন সন্তানদের। সেই দুই সন্তান পাষণ্ডের মতো অসুস্থ বাবাকে একলা ফেলে গেছেন রাস্তায়। সেখান থেকে তাকে তুলে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছে একটি বৃদ্ধাশ্রম।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃস্ব সেলিম মাস্টার শুধুই চোখের পানি ফেলেন নীরবে নিভৃতে। এতকিছুর পরও সন্তানদের কথা জিজ্ঞাসা করলেই হু হু করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
সেলিম মাস্টার কালবেলাকে বলেন, ‘আমার মেয়েরা বেইমান। এত বেশি ভালোবাসা দিয়ে তাদের বড় করেছিলাম। আজ তারাই আমাকে ঘর ছাড়া করেছে। তবুও আল্লাহ ওদের ভালো রাখুক।’
শুধু লন্ডনি মা বা সেমিল মাস্টার নয় এমন শত শত বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা বসবাস করছেন দেশের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে। যাদের কাছে ভালোবাসা দিবস কোনো বিশেষ দিন নয়। প্রতিটি দিনই সন্তানের জন্য ভালোবাসা বিলিয়েছেন তারা।
বয়স ৬৫ বছরের শহরা বানু সংসারে ছিল ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনি। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত শহরা ভালোবেসে যে ছেলেকে বড় করেছিলেন। সেই ছেলেই এক দিন প্রচণ্ড মারধর করে বৃদ্ধা মাকে। মারের চোটে ভেঙে যায় বৃদ্ধ মায়ের ডান হাত। শুধু মারধরই নয়, বের করে দিয়েছেন বাড়ি থেকেও।
রাস্তায় ঘুরতে থাকা সেই মায়েরও ঠিকানা এখন ঢাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে।
এই প্রতিবেদকের কাছে নিজের কষ্টমাখা স্মৃতিগুলো বলতে বলতে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন শহরা বানু। বলছিলেন, ‘পোলাডা আমারে মারছে। হাতটা ভেঙে দিছে। এখন তো ওরা ভালোই আছে।’
শহরা বানুর কথাগুলো শুনছিলেন বৃদ্ধাশ্রমের পাশে বেডের আরেক মা হামেদা বেগম। কথা শেষ না হতেই হামেদা বলে উঠলেন, ‘ওরা কি মানুষ। ওরা মানুষ না জানোয়ার। মায়েরে মাইরা হাত ভেঙে দিছে।’
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা আরেক মায়ের আক্ষেপটা অনেক বেশি। তার নাম শেলী বেগম। যাকেই কাছে পান তার কাছেই করেন সন্তানদের বিরুদ্ধে নানা রকমের অভিযোগ।
অভিমানের স্বরে তিনি বলছিলেন, সারাজীবন ওরা (তার সন্তানেরা) কত বায়না করছে, কতকিছু চাইছে, কত রাত ঘুমাই নাই সন্তানের জন্য। এখন বুইড়া হইছি ওরা (তার সন্তানেরা) আমাদের ঝামেলা মনে করে।
মন্তব্য করুন