সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৩, ০৬:১৩ পিএম
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৩, ১০:০৫ এএম
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা নীতির ভিসেরা!

প্রতীকী ছবি

মূলত ভিসা নীতি হলো প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি, যার মাধ্যমে অন্য দেশের নাগরিকগণ সেই দেশে প্রবেশ করতে পারে- স্বল্পমেয়াদী, ভ্রমণকারী, অস্থায়ী কর্মী, স্থায়ী অভিবাসী, পড়াশোনার জন্য, চাকুরী সূত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার ধারণাটাও প্রাথমিকভাবে এরকম। তবে ব্যতিক্রম আছে, চল্লিশটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢুকতে গেলে ভিসা লাগে না।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আ্যন্টনী ব্লিংকেন বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছেন। এ মতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য দায়ী বা জড়িত বলে মনে করে যে কোন বাংলাদেশি নাগরিকের ভিসা প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। নীতি অনুযায়ী অন্য অনেকের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান বা সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, সরকারের সমর্থক এবং বিরোধী দলীয় সদস্যরা এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতি ঘোষণার পর এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কেউ বলছেন এটি বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে পদক্ষেপ, কেউ বলছেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য, কেউ বলছেন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বহিঃপ্রকাশ, কেউ বলছেন এটি তাদের কৌশলগত নীতি। তবে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বলছে এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি।

স্বাধীনতার পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। তবে স্বাধীনতা পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যা ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলে অন্যতম। করোনাকালে যখন এদেশে ভ্যাকসিন সংকট চলছিল তখন এ দেশটি নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে। পাঁচ কোটি ভ্যাকসিন অনুদান দেয়। বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করছে। দুদেশের সরকারই সহযোগিতার এ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, সন্দেহ নেই। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এ দেশটির মানবিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু ও নিরাপত্তা জনিত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে উঠছে।

গত স্বাধীনতা দিবসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়া জাতি স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার মূল্য গভীরভাবে বোঝে। এই যে স্বাধীনতা যার জন্য আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক সে দেশটির মূল চারটি উপাদানের চূড়ান্ত হচ্ছে সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্ব হচ্ছে কোন দেশের বা রাষ্ট্রের নিজের অভ্যন্তরীণ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা। বাইরের কোন উৎস বা সংগঠনের হস্তক্ষেপ ছাড়া কাজ করার পূর্ণ অধিকার ও ক্ষমতা।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রের নিজস্ব এখতিয়ারাধীন বিষয়। সরকার বা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন যদি চায় সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যবস্থায় সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টা ভিসানীতির সমান্তরালে সামনে নিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র এক অর্থে আমাদের কিন্তু ক্ষতি করে দিল। কীভাবে?

দেখুন ক্ষতিটা কিরূপে হচ্ছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নির্বাচন ব্যবস্থা মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কারো আচরণ বা কর্ম যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী না হলে বা তাদের বিপরীতে গেলে ওই ব্যক্তি বা ওই ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত পরিবারের সদস্য ভিসা পাবে না বা ভিসা বাতিল হবে। স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর ঋণাত্মকভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এক্ষেত্রে মানসিকভাবে 'ডাউন' হয়ে পড়লাম। যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি কানাডাও বলছে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করবে, যদিও এখনো প্রকাশ্যে বলেনি । ই ইউ বলছে তারা করবে না, ভারত বলছে তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি পর্যালোচনায় এই বিষয়গুলো না আনলে অন্য কোন দেশ কখনই তা সামনে আনত না এটা সহজে অনুমেয়।

সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে এ সিদ্ধান্তে অস্বস্তি শুরু হয়েছে। আমি কিন্তু সরকার বা বিরোধী দল বলছি না। রাষ্ট্রের সার্বভৌম আচরণ সব নাগরিকের জন্যই। মার্কিন নীতিও তা বলছে না। কিন্তু এই যে তাদের স্ট্যান্ডার্ড ,অবাধ ও সুষ্ঠু এর মধ্যে কতটুকু সুষ্ঠু, কতটুকু অংশগ্রহণমূলক কিংবা নির্বাচনে ব্যক্তির আচরণবিধি কিরূপ হবে এক্ষেত্রে তাদের কোন নির্দেশনা আছে কিনা সেটাও স্পষ্ট নয় । আর যদি নির্দেশনা থাকে? ভালো তো ! আপনি বাংলাদেশের নাগরিক। কতটুকু কী করতে পারবেন ডিসিশন আসবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ব্যবসা, চাকরি, পড়াশোনা, যোগসূত্র নানা কারণে ভিসা নীতিতে না পড়ার জন্য ব্যক্তিগত লবিং, সিন্ডিকেট লবিং কিংবা নিবিড় যোগাযোগ যদি বেড়ে যায় কী হবে ভেবে দেখেছেন? একটি বিষয় বিনষ্ট হয়ে যাবে তা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি।

লবিং কিন্তু আমরা কম দেখিনি। মিলিয়ন ডলার খরচ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের চেষ্টা হয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত বিচার বন্ধের জন্য ফোন কল করেছিলেন। মানবাধিকার নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু সেনা অভ্যন্তরে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়েছিল, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে যখন বিরোধীদের নানাভাবে দমন করা হলো, ২০০১ সাল পরবর্তীতে হাজার হাজার ভিন্ন মতাদর্শীদের হত্যা, ধর্ষণ, গ্রেপ্তার করা হলো, সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হলো, হ্যাঁ না ভোট, '৮৮ এর নির্বাচন, ২০০১ সালের কারচুপির নির্বাচন, ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এগুলোওতো বাংলাদেশ দেখেছে। তখনতো স্যাংশন করা হয়নি। কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গের হত্যার বিচার চেয়ে, জাতীয় চার নেতা হত্যার বিষয়ে কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে টু শব্দটি পর্যন্ত করা হয়নি।

প্রশ্নের জায়গা আরও বেড়ে যায় যখন দেখি গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। পরপর দুটি গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, মূলত: কর্তৃত্ববাদী শাসন, দুর্নীতি ও মানবাধিকার হরণ প্রতিরোধে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসার জন্যই এ সম্মেলন আহবান করা। গণতন্ত্রের সূচক ২০২১ এ চোখ বুলাই। সেটা ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের করা। এটাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে কাজ করেছে।

যদিও এই সূচকের চেয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সূচক অনেক বেশি হওয়ার কথা বলে আমার ধারণা। এমনকি তাদের সাম্প্রতিক সূচকেও বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। ২০২১ সালকেই ভিত্তি হিসেবে ধরলাম। সেবার বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫.৯৯। বাংলাদেশের থেকে কম স্কোরের যারা গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে অংশগ্রহণ করেছে তারা হলো মালাউই (৫.৭৪), সেনেগাল (৫.৬৭), আরমেনিয়া (৫.৩৫), লাইবেরিয়া( ৫.৩২), জর্জিয়া (৫.৩১), নেপাল (৫.২২), কেনিয়া (৫.০৫), জাম্বিয়া (৪.৮০), পাকিস্তান (৪.৩১), নাইজেরিয়া (৪.১৬), এংগোলা (৩.৬৬), ইরাক (৩.৬২), নাইজার (৩.২৯), ডি আর কংগো (১.১৬)। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে কম স্কোরের বেশ কিছু রাষ্ট্র এখানে আমন্ত্রিত হয়, অংশগ্রহণ করে, বিভিন্ন সেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, এখানে ইসরায়েলের মতো সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত দেশটিও আমন্ত্রণ পেয়েছে।

যে কেউই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী অন্য অনেক দেশ থেকে গণতন্ত্র, মানবিকতা, মানবাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। কিছু ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে তো যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় অংশীদার। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশকে কেন আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না, কিংবা ভিসা নীতির নতুন করে মূল্যায়ন এসব দেখে যে কারণে বিষয়টি বুঝতে আর বাকি থাকে না। এটা এক ধরনের 'অনুগত গণতন্ত্র' তৈরি করার চেষ্টা, প্রভাব বলে স্থায়ী করার জন্য, কেমন জানি আমেরিকান সমিতি তৈরি করার মতো হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন থেকে কখনোই সরে আসবে না। ভারসাম্যমূলক কূটনীতি বজায় রেখেই চলবে। এ পরিস্থিতিতে সেন্টমার্টিনে ঘাঁটি করা বা এলএনজির জন্য বিশেষ কোনো কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, এ বিষয়গুলোকে আড়ালে রেখে নির্বাচন ইস্যুতে ভিসা নীতি, দুদেশের সম্পর্কে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে বহুমাত্রিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসা নীতি পুনর্মূল্যায়ন করবে বলে আশা করছি।

লেখক: সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী, পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক ,আমরা ক'জন মুজিব সেনা

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গবন্ধুর দুঃসময়ের বন্ধু, কিংবদন্তি রাজনীতিক শওকত আলী

১৩০ টাকায় শুরু করা নার্সারির বাজারমূল্য ২০ লাখ

যশোরে ভাষা শহীদদের স্মরণে ৫২শ মোমবাতি প্রজ্বলন

শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল

সাভারে খঞ্জনকাঠি খাল উদ্ধার করল উপজেলা প্রশাসন

শোক ও গৌরবের একুশে আজ

২১ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

ইতিহাসের এই দিনে যত ঘটনা

গ্রিজমানদের খালি হাতেই ফেরত পাঠাল ইন্টার মিলান  

একটি হুইল চেয়ারের আকুতি প্রতিবন্ধী সিয়ামের

১০

ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে চবিতে ফুলের দাম বেড়েছে ৩ গুণ

১১

সীমান্তে শেষবারের মতো সরুকজানের লাশ দেখল স্বজনরা

১২

‘উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই’- প্রাণিসম্পদমন্ত্রী

১৩

সৌদি বসে ঢাকায় ডাকাত দল চালায় ইলিয়াস

১৪

‘ডাল ভাত খেয়েও যুদ্ধ করতে পারি’

১৫

ভাষা শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

১৬

কোম্পানি রিটার্নের মেয়াদ ২ মাস বাড়ানোর দাবি এফবিসিসিআইর

১৭

ন্যায্যতা সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস / উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান 

১৮

এমপিদের থোক বরাদ্দের আগে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবি টিআইবির

১৯

চাকরি গেল জাবির আলোচিত সেই শিক্ষকের

২০
X