

বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের এক বছর পরও সিরিয়া নানা গভীর সংকটের মুখে রয়েছে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো জাতীয় সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী পুনর্গঠন করা। তবে এই প্রক্রিয়ায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার।
রোববার (০৪ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে একটি কঠোর দমনমূলক শক্তি হিসেবে দেখা হতো। তাদের মূল কাজ ছিল শাসকগোষ্ঠীকে রক্ষা করা ও ভিন্নমত দমন করা। নতুন সরকার সেই ধারা বদলাতে চায়।
আলেপ্পোতে সামরিক একাডেমি থেকে উত্তীর্ণ সেনাদের এক অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুরহাফ আবু কাসরা বলেন, আমরা সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি বাহিনী গড়া, যা দেশের প্রতি অনুগত থাকবে এবং সিরিয়ার সব জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করবে। সেনাবাহিনীর সব শাখার সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এজন্য ইতোমধ্যে আচরণবিধি ও শৃঙ্খলাবিধি জারি করা হয়েছে।
পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা
বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মানসিকতা পরিবর্তন করে তাদের একটি পেশাদার ও সংগঠিত সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করা। এর পাশাপাশি রয়েছে নতুন সদস্য যাচাই-বাছাই (ভেটিং), অস্ত্র ও সরঞ্জাম নির্বাচন, বিভিন্ন অঞ্চলের বাহিনী একীভূত করা এবং সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনের প্রশ্ন।
নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউটের ক্যারোলাইন রোজ বলেন, যদি সিরিয়া সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটি ভাঙনের অস্তিত্বগত ঝুঁকিতে পড়বে। এতে আবারও গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আল-আসাদ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সেনাবাহিনী কার্যত ভেঙে পড়ে। বহু সেনা দেশ ছেড়ে পালায়, কেউ আত্মগোপনে যায়, আবার কেউ অস্ত্র জমা দেয়। এই সুযোগে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তারা সিরিয়ার ৮০ শতাংশ কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করেছে। গত এক বছরে সিরিয়ায় ৬০০-র বেশি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। পুরোনো সেনা কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের কারণে নতুন সিরীয় সেনাবাহিনী কার্যত শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করেছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা পুরোনো সেনাবাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে, যা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য অপর্যাপ্ত। এরইমধ্যে সরকার ব্যাপক হারে নতুন নিয়োগ শুরু করেছে। তবে দ্রুত নিয়োগের কারণে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি। অর্থনৈতিক সংকটে থাকা বহু তরুণ নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার আরেকটি স্পর্শকাতর ইস্যু হলো বিদেশি যোদ্ধারা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বিদেশি যোদ্ধাদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে রাখা যাবে না। প্রেসিডেন্ট আল-শারা আশ্বাস দিয়েছেন, তারা কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসাদ আমলে সিরিয়া মূলত রাশিয়া ও ইরানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে নতুন সরকারের অধীনে দেশটির কূটনৈতিক অবস্থান বদলেছে। সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশ সমর্থন দিচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে।
নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট আল-শারা হোয়াইট হাউস সফর করেছেন। তার এ সফর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে সামরিক দিক থেকে সিরিয়ার সেনাবাহিনী এখনো রুশ অস্ত্র ও নীতির ওপর নির্ভরশীল রয়েছে। বিশ্লেষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড বলেন, রাশিয়ার ওপর এই নির্ভরতা সিরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য সমস্যা তৈরি করছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সিরীয় সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে। আইএসবিরোধী জোটে সিরিয়ার অন্তর্ভুক্তির ফলে মার্কিন প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টার উপস্থিতি বাড়তে পারে। তুরস্কও সিরিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এর আওতায় ৪৯ জন সিরীয় ক্যাডেট তুরস্কের সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা সত্ত্বেও দেশের ভেতরে আস্থা সংকট রয়ে গেছে। উপকূলীয় অঞ্চল ও সুয়াইদায় সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে।
মন্তব্য করুন