৪৩তম দিনে গড়িয়েছে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ। ক্রমেই বাড়ছে এ অঞ্চলে মানবিক সংকট। এরমধ্যে গত অক্টোবর থেকে গাজায় স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনারা। এমনকি তাদের এ কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাচ্ছে না গাজার হাসপাতাল। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফের এমন কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ বলে তার তদন্ত চেয়েছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। খবর এএফপির।
আইসিসির প্রসিকিউটর করিম খান এএফপিকে নিশ্চিত করেছেন যে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে একটি যৌথ আবেদন করেছে পাঁচ দেশ। এ দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, কমোরোস এবং জিবুতি। দক্ষিণ আফ্রিকা বলেছে, ফিলিস্তিনের গুরুতর পরিস্থিতির প্রতি আইসিসির জরুরি মনোযোগ নিশ্চিত করার জন্য তারা এই আবেদন করেছে।
পাঁচ দেশের আবেদনের সঙ্গে যুক্ত হতে আইসিসির অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যার দায়মুক্তির অবসান ঘটাতে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের প্রত্যাশা, ভুক্তভোগীরা যেন ন্যায়বিচার পায় তা নিশ্চিতে ফিলিস্তিন ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ইসরায়েল আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র না হলেও ফিলিস্তিন এই আদালতের সদস্য। ফলে ইসরায়েলের সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে আইসিসির কোনো বাধা নেই। গত মাসে গাজা ও মিসরের সীমান্তপথ রাফাহ ক্রসিং পরিদর্শন করতে গিয়ে করিম খান বলেছিলেন, হামাসের হামলা ও ইসরায়েলি বিমান হামলার—দুই বিষয়ে তদন্তের এখতিয়ার রয়েছে আইসিসির।
ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ বললেন এরদোয়ান
ইসরায়েলকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেছেনতুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেন, ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। সম্প্রতি তুরস্কের সংসদে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আলাপকালে এরদোয়ান এসব কথা বলেন।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, হামাস কোনো ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ নয়। তারা ফিলিস্তিনি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি রাজনৈতিক সত্তা। ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না তা ঘোষণা করতে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে এরদোয়ান আরও বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে তুরস্ক আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাজ করবে।
গাজায় ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞের সমালোচনা ম্যাখোঁর
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞের সমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ।তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েল যা করছে তার কোনো বৈধতা বা যৌক্তিকতা নেই। ফিলিস্তিনি নারী-শিশুদের হত্যার কঠোর সমালোচনা করে ম্যাখোঁ আরও বলেন, গাজায় অসহায় নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের বোমা মেরে হত্যা করছে ইসরায়েল এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বৈধতা নেই। শিগগিরই এই যুদ্ধ বন্ধ করা জরুরি।
হামলা বন্ধের আহ্বান কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীকে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ইসরায়েলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলকে নারী, অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে এবং শিশু হত্যা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। প্রায় দেড় মাস আগে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে প্রথম ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনায় সরব হলেন ট্রুডো।
ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর অনুরোধ জানিয়ে ট্রুডো আরও বলেন, সারা বিশ্ব টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে সব কিছু দেখছে। বিশ্ববাসী ডাক্তার, পরিবারের সদস্য, বেঁচে যাওয়া মানুষসহ বাচ্চাদের যারা তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছে তাদের কথা শুনছে। সারা বিশ্ব গাজার ঘটনা দেখছে। কাজেই ইসরায়েলকে অবশ্যই এই অপরাধযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে।
হাসপাতালে হামলা
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্বরতা যেন থামছেই না। দেড় মাসের টানা হামলায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলি এমন নিষ্ঠুরতা থেকে বাদ যাচ্ছে না গাজার স্কুল, মসজিদ বিংবা হাসপাতালাও। গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল-শিফা হাসপাতালে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। এমনকি মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠিত একটি চিকিৎসাকেন্দ্রও তাদের হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
আলজাজিরার দেওয়া সংবাদ সূত্রে বলা হয়, মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাজায় তার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠিত একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ইসরায়েলি বোমা হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহাথির। হাসপাতাল ধ্বংসের খবর জেনে মাহাথির মোহাম্মদ বিচলিত হয়ে পড়েন। সংবাদ সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে অবস্থিত ডা. সিতি হাসমাহ অ্যান্ড এনায়া ফিজিওথেরাপি সেন্টারটি ধ্বংস হয়ে যায়।
এ নিয়ে মাহাথির মোহাম্মদ এক্স বার্তায় বলেন, তার পেরদানা গ্লোবাল পিস ফাউন্ডেশন গাজায় এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছিল। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ২০১৯ সালে ওই চিকিৎসাকেন্দ্রটি চালু করা হয়।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, এটি সামরিক বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ নয়, বরং গাজাকে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে মুক্ত করার জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখানে গণহত্যা চালাচ্ছে। হাসপাতাল ও বাসস্থানে বোমা হামলার পর ফিজিওথেরাপি কেন্দ্রেও এই ধরনের হামলা এটাই প্রমাণ করেছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে এসব স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
ব্যর্থতার কথা স্বীকার নেতানিয়াহুর
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। তবে তাদের সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলে স্বীকার করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন।
মার্কিন টিভি চ্যানেল সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, যে কোনো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু দুঃখজনক। আমরা বেসামরিক মানুষকে যুদ্ধের বাইরে রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তবে হামাস এটা করছে না। তারা মানুষকে এর মধ্যে রাখতে সব কিছু করছে।
তিনি বলেন, তাই আমরা লিফলেট বিতরণ করেছি। আমরা তাদের ফোনে কল করেছি এবং বলেছি : চলে যান। অনেকে চলেও গেছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখেই আমরা আমাদের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করব। আমরা এটাই করার চেষ্টা করছি। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা সফল হয়নি।
ইসরায়েলের আলটিমেটাম ‘যুদ্ধাপরাধ’ : নরওয়ের শরণার্থী কাউন্সিল
গাজায় স্থল অভিযান শুরুর আগে উত্তরাঞ্চলের ১১ লাখ বাসিন্দাকে দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে ২৪ ঘণ্টার অলটিমেটাম দিয়েছিল ইসরায়েল। তাদের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে নরওয়ের শরণার্থী কাউন্সিল। তারা ইসরায়েলের এমন আলটিমেটামকে যুদ্ধাপরাধ বলে মন্তব্য করেছে।
নরওয়ের শরণার্থী ক্যাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল জন এগল্যান্ড বলেন, গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে জোরপূর্বক ১১ লাখ ফিলিস্তিনিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ যুদ্ধাপরাধ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাাতিক আইনানুসারে জোরপূর্বক কোনো জনগণকে স্থানান্তর করা যুদ্ধাপরাধের শামিল। ইসরায়েল এমন আলটিমেটাম দিলেও তারা কখন নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে তাও জানানো হয়নি। ইসরায়েলের এমন আদেশকে তিনি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলেনও মন্তব্য করেন।
জাতিসংঘের ত্রাণ প্রধানের বক্তব্য
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর গণহত্যা চলতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি মার্টিন গ্রিফিথস। তিনি বলেন, গাজায় ইসরায়েলের এ হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। এ ছাড়া তিনি এ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতিরও আহ্বান জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের ত্রাণ প্রধান বলেন, গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ প্রতিদিনই নতুন ভয়াবহ উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। তারা সেখানকার হাসপাতালে হামলা চালাচ্ছে। এতে হতবাক হয়েছে বিশ্ববাসী। সেখানে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশুরা মারা যাচ্ছে এবং বেঁচে থাকার সব মৌলিক উপায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গাজার সামগ্রিক জনগোষ্ঠী।
তিনি বলেন, গাজায় এমস অবস্থা চালিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। যুদ্ধের সমর্থনকারীদের আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে সম্মান করতে হবে। তাদের মানবিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে এবং যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।
মন্তব্য করুন