রাজকুমার নন্দী
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৩ এএম
আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:৩৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি নেতাদের আজ প্রকাশ্যে আসার পরীক্ষা

সারা দেশে মানববন্ধন
বিএনপির লোগো।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে আজ রোববার ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা শহরে মানববন্ধনের কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি ও যুগপতে থাকা মিত্ররা। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির যৌথ উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই কর্মসূচি পালন করবে দলটি। কর্মসূচির বিষয়ে অবহিতকরণ এবং নিরাপত্তা চেয়ে গতকাল শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মানববন্ধন ঘিরে প্রায় দেড় মাস পর আবার মাঠে নেতাকর্মীদের জমায়েতের ‘প্রকাশ্য’ কর্মসূচিতে ফিরতে চায় বিএনপি। একই সঙ্গে কর্মসূচি থেকে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সার্বিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের চিত্র গণতান্ত্রিক বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে দলটি। কর্মসূচি সফলে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতারা যখন গ্রেপ্তার এবং অন্যরা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন, এমন বাস্তবতায় রাজপথের এই প্রকাশ্য কর্মসূচিরও সফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কর্মসূচি ঘিরে প্রকাশ্যে আসতে পারাই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অনেকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় মানববন্ধনের এই কর্মসূচি সফল করা বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশব্যাপী হরতাল-অবরোধ চললেও সেটা ওইভাবে আবেদন তৈরি করতে পারেনি। কর্মসূচি ঘিরে নেতাকর্মীরা ব্যাপক হারে মাঠে নামতে পারেনি। বিক্ষিপ্তভাবে ‘ঝটিকা মিছিলে’ পালিত হয়েছে কর্মসূচি। তাই মানববন্ধনের এই কর্মসূচি ঘিরে আত্মগোপন থেকে নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচনী ট্রেনও ক্রমেই গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। এমন বাস্তবতায় কর্মসূচির সফলতার ওপর বিএনপির আগামী দিনের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ভর করছে বলে মনে করেন তারা।

তাদের মতে, সারা দেশে নেতাকর্মীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে মানববন্ধনের কর্মসূচি সফল হলে আন্দোলন ও নির্বাচন ঘিরে দলটির তৃণমূলে যেমন হতাশা কাটবে, তেমনি নেতাকর্মীদের মনোবলও চাঙ্গা হবে। এর ফলে আগামীতে বিএনপির আন্দোলনও গতি পাবে। এতে করে সরকারের ওপরও চাপ তৈরি হবে। অন্যদিকে কর্মসূচি সফল না হলে তৃণমূলে নেতাকর্মীদের হতাশা আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে বিএনপির ভোট ঠেকানোর আন্দোলন সফল হওয়ার আশাও ক্ষীণ হয়ে পড়বে।

জানা গেছে, নির্বিঘ্নে মানববন্ধন সম্পন্ন করতে পারলে সাময়িকভাবে হরতাল-অবরোধের বিকল্প কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। অন্যথায় দাবি আদায়ে ফের হরতাল-অবরোধের কর্মসূচিতে ফিরবে বিএনপি ও যুগপতের শরিকরা।

গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী সংঘর্ষে জড়ায়। এই ঘটনার জেরে ঢাকায় প্রায় অর্ধশত মামলা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে ৪-৫ দিন আগ থেকে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের ২০ হাজার ৬৬৫ জনের অধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয় ১৭৫ জনের অধিক নেতাকর্মীকে।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান বাস্তবতায় মানববন্ধনের কর্মসূচি সফল করতে তারা কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করেছে। কৌশলের অংশ হিসেবে মামলা ও পরোয়ানা থাকা নেতারা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন না, যাদের বিরুদ্ধে মামলা নেই, দল ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন এবং মহানগরের এমন অল্প পরিচিত নেতাকর্মীরা উপস্থিত হবেন। মূলত জাতীয়তাবাদী মহিলা দল এবং অন্য অঙ্গসংগঠনের নারী নেতাকর্মীরাই কর্মসূচিতে ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ করবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ড্যাব) বিএনপিপন্থি পেশাজীবী নেতারাও কর্মসূচি থাকবেন। এদের সঙ্গে বিএনপির কারাবন্দি এবং গুম-খুন পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেবেন। কর্মসূচিতে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমান উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে।

বিএনপির অভিযোগ, সরকার মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটিয়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলবিহীন ‘একতরফা’ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তা পশ্চিমাসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে ফের তুলে ধরবেন তারা। দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে যে মানবাধিকার নেই, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে সেটা প্রতিষ্ঠিত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।

প্রতি বছরই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল দেশটি। গত ২৫ মে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় বাধা দিলে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা না দেওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ভিসা নীতি কার্যকর করার কথাও জানায় দেশটি। বিএনপি নেতাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল গণতান্ত্রিক বিশ্ব বিশেষ করে পশ্চিমারা। তাছাড়া তারা বাংলাদেশে একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ইস্যুতে এক বছরের বেশি সময় ধরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। তাদের ভূমিকা শিগগিরই আরও জোরালো করবে।

এদিকে বিএনপির পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলনে থাকা অন্যান্য দল ও জোটগুলোও এই কর্মসূচি পালন করবে। ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ সকাল ১১টায় কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ের সামনে, একই সময় ‘১২ দলীয় জোট’ বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে, ‘জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট’ পুরানা পল্টন মোড় সংলগ্ন আলরাজী কমপ্লেক্স, এলডিপি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, ‘গণফোরাম ও বাংলাদেশ পিপলস পার্টি’ হাইকোর্ট কদমফুল ফোয়ারার উল্টো দিকে, গণঅধিকার পরিষদ (নুর) বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে, দলটির অপর অংশ পুরানা পল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য জাতীয় প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে এবং বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে। এ ছাড়া লেবার পার্টি দুপুর ১২টায় তোপখানা রোডে মেহরাবা প্লাজার সামনে এবং এবি পার্টি বিকেল ৩টায় বিজয়নগরে কর্মসূচি পালন করবে।

সরকারের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত থাকায় বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলোর রাজপথে মানববন্ধনের প্রকাশ্য কর্মসূচি সফলে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। তিনি কালবেলাকে বলেন, সরকার ২৮ অক্টোবরের পর থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে বিএনপিকে রাজপথে কোথাও দাঁড়াতে দেয়নি। এমন অবস্থার মধ্যেও রাজপথে থেকে আন্দোলনকে জোরদার করতে মানববন্ধনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় এ কর্মসূচি সফলেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা বিএনপিসহ যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দলগুলোর এই কর্মসূচি ঘিরে সরকারের ভূমিকা কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের গতি-প্রকৃতি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সম্প্রতি বাংলাদেশের গোলটেবিল আলোচনা / ‘ভাষাকে শক্তিশালী করতে অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে’

সাড়া ফেলেছে মনিরুল ইসলামের ‘পথভোলা পথিকেরা’

মীর হামজার ‘ডেইলি স্টার এ লেভেল এওয়ার্ড’ অর্জন 

মাথাব্যথা কমাতে ওষুধ না খেয়ে কী কী করবেন?

পাকিস্তানে নতুন সরকার গঠনের পরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রোধে ভোক্তাদেরও সতর্ক থাকতে হবে : খাদ্যমন্ত্রী

এ কেমন শত্রুতা!

বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রমজানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 

পরকীয়ার জেরে ৩ সন্তা‌নের জননী‌কে গলা কেটে হত্যা, আটক ১

১০

আলভেজকে সাহায্য করে বিপাকে নেইমার

১১

‘আইন গরিবের জন্য, বড়লোকরা বিভিন্নভাবে রক্ষা পায়’

১২

আরও ৩৭ জনের করোনা শনাক্ত

১৩

বিএনপি নেতা প্রিন্সের বাসায় মঈন খান

১৪

ভাসানচর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, পাঁচ শিশুসহ দগ্ধ ৯

১৫

খেলার মাঠে ক্রিকেটারের মৃত্যু

১৬

সমাপ্তির পথে ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ ফ্র্যাঞ্চাইজি

১৭

৯৫০ টন কয়লা নিয়ে দুর্ঘটনার কবলে জাহাজ

১৮

চীনে বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৫

১৯

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডায় বৃত্তির সুযোগ

২০
X