রীতা ভৌমিক
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৪, ০২:২৮ এএম
আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৪, ০৭:৪৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা হাব

পথশিশু ৩০ লাখ, সুরক্ষিত দেড় হাজার

পথশিশু ৩০ লাখ, সুরক্ষিত দেড় হাজার

পথশিশু মোহাম্মদ পারভেজ। বয়স ১৪ বছর। কাজ করে গাড়ির মেকানিকের দোকানে। রাত কাটে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে শিশু সুরক্ষার তাঁবুতে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাড়ি পাশে কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে একদিন ট্রেনে উঠে পড়ে। ট্রেন এসে থামে ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমে কিছুই চেনে না। স্টেশনেই কাটে কয়েকদিন। সেখানে কয়েকজন পথশিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। ওদের সঙ্গে ট্রেনে চলে যায় নারায়ণগঞ্জ। সেখানে কয়েকদিন কাটিয়ে আবার ট্রেনে চেপে বসে। এবার নামে কমলাপুর রেলস্টেশনে। এরপর থেকে সেখানেই বসবাস।

পারভেজ বলে, তখন অনেক ছোট ছিলাম। গ্রামের নাম মনে নেই। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। এভাবে হারিয়ে যাই পরিবার থেকে। ভাঙাড়ির দোকানে কাজ করে এক পথশিশু বন্ধু আমাকে এখানে নিয়ে আসে বছরখানেক আগে।

পারভেজের মতো অনেক পথশিশুর রাত-দিন কাটে পথশিশুদের সুরক্ষায় সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের আওতায় তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা সার্ভিস হাবে। তবে সে সংখ্যা খুবই কম। দেশের রাস্তাঘাটে বসবাসকারী পথশিশুরা চরম দারিদ্র্য, অপুষ্টি, রোগ, নিরক্ষরতা, সহিংসতাসহ নানা বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। এই পথশিশুদের পরিবারে ফেরাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে পথশিশুদের সুরক্ষায় সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের আওতায় ২০২১ এপ্রিলে চারটি তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা সার্ভিস হাব নির্মাণ করা হয়।

ঢাকা শহরের গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, সদরঘাট ও কমলাপুর রেলস্টেশনে তিনটি এবং রংপুর রেলস্টেশনে একটি হাব নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি হাবে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্য দুটি ইউনিট করা হয়। দেশে পথশিশুদের তুলনায় তাঁবুভিত্তিক এই হাবের সংখ্যা খুবই কম। তাই সব পথশিশুকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হলে তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা সেবার পরিমাণও বাড়াতে হবে।

জানা গেছে, তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চারটি হাবে ১ হাজার ৬৫৫ পথশিশুকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গাবতলী বাসস্ট্যান্ড হাবে ৪৫৬, সদরঘাট লঞ্চঘাট হাবে ৪৫৫ ও কমলাপুর রেলস্টেশন হাবে ৪৩৫ এবং রংপুর রেলস্টেশন হাবে ৩০৯ পথশিশুকে সেবা দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ কমলাপুর বালুর মাঠে তাঁবু টানিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে কমলাপুর রেলস্টেশন হাব। এখানে প্রায় ৩৫ পথশিশুকে তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা সেবা কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।

আরেক পথশিশু মোহাম্মদ আকিজের মা নেই, বাবা আবার বিয়ে করেছে। সৎমায়ের অনাদর-অবহেলায় বাড়িতে মন টিকছিল না তার। ছোট্ট আকিজ বাবা-সৎমায়ের সঙ্গে অভিমান করে একাই চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আসে। পরে ট্রেনে উঠে চলে আসে ঢাকায়। কমলাপুর রেলস্টেশনে নেমে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। তাদের সঙ্গে ভাঙাড়ি কুড়িয়ে তা বিক্রি করে। যা পায় তা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে বড় হতে থাকে।

১২ বছরের আকিজ বলে, এখন প্রতিদিন ভাঙাড়ি টোকাই না। মাঝেমধ্যে টোকাই। কারণ এখানে লেখাপড়া করি।

তাঁবুভিত্তিক শিশু সুরক্ষা সেবা কার্যক্রমের কমলাপুর হাব ফেসিলেটর জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পথশিশুরাই পথশিশুদের এখানে নিয়ে আসে। এ ছাড়া মাঠপর্যায় পরিদর্শন করেও আমরা পথশিশুদের এই হাবে নিয়ে আসি। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী পথশিশুদের এই হাবে রাখা হয়। ইউনিয়ন খাতায় তাদের নাম, বয়স, স্থায়ী ঠিকানা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দিনে ৩৫ জন পথশিশু সেবা পেলেও রাতে ২০ থেকে ২২ জন পথশিশু এখানে থাকে।

এ ব্যাপারে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের সিএসপিবি প্রকল্পের সহকারী পরিচালক সিরাজুম মনির আফতাবী কালবেলাকে বলেন, যে কোনো পথশিশু হাবগুলোতে ছয় মাসের বেশি থাকতে পারবে না। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটে অবস্থান করা পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় ও পরিবারের সঙ্গে একত্রীকরণই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এজন্য এ শিশুদের তিন বেলা খাবার, জীবনভিত্তিক দক্ষতা, নন-ফরমাল এডুকেশন, কেস ম্যানেজমেন্ট, কাউন্সিলিং, সচেতনতামূলক পরামর্শ, নাচ-গানও শেখানো হয়।

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ‘রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশুদের মর্মান্তিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক ২০২৪ সালের মার্চে এক গবেষণা প্রতিবেদন উঠে এসেছে। দেশের সব জেলার ৪০০ শিশুর কাছে সরাসরি গিয়ে সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এই প্রতিবেদনে পথশিশুদের জীবনের হৃদয়বিদারক গল্প, বহুমুখী সমস্যা, মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এখানে উঠে এসেছে। জরিপে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী পথশিশুদের মোট সংখ্যা না থাকলেও ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে এ সংখ্যা ৩০ লাখ ৪০ হাজারের বেশি।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ কালবেলাকে বলেন, সিএসপিবি প্রকল্পটি একটি সময় বা উপলক্ষ ধরে করা হয়েছিল। মেয়াদ শেষ হলে আবার চালু করা হবে কি না, সেটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয়। তবে পথশিশুদের সুরক্ষার কাজ থেমে থাকবে না।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাইক্রোসফট ওয়ার্ড ফাইল নিজেই জমা হবে অনলাইনে, কতটা ভালো?

ভিডিও তৈরির যে অ্যাপ সবার জন্য উন্মুক্ত করল গুগল

ময়মনসিংহে জাপার অফিস ভাঙচুর

গণঅধিকার পরিষদের দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা

স্বাস্থ্য পরামর্শ / মোটরযানের কালো ধোঁয়া ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি

নুরের ওপর হামলার নিন্দা / আমরা অত্যন্ত নাজুক সময়ে আছি : তারেক রহমান

নুরের অবস্থা মুমূর্ষু, বাঁচবে কি মরবে জানি না : রাশেদ

নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে নিজ উপজেলায় বিক্ষোভ

ডাচদের সাথে লিটনদের লড়াই দেখবেন যেভাবে

নুরের ওপর হামলা / ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ

১০

কী বলে নুরের ওপর হামলা করা হয়, জানালেন ইয়ামিন মোল্লা

১১

আফগানদের হারিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে শুভ সূচনা পাকিস্তানের

১২

নুরের ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতি

১৩

আইসিইউতে নুর, ৪৮ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবে না : চিকিৎসক

১৪

নুরের ওপর হামলা ‘অত্যন্ত ন্যক্কারজনক’: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব

১৫

নুরের ওপর হামলায় ১০১ সংগঠনের বিবৃতি

১৬

নুরকে দেখতে এসে আসিফ নজরুল অবরুদ্ধ 

১৭

আহত নুরকে দেখতে ঢামেকে প্রেস সচিব

১৮

সহিংসতার ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি

১৯

সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি : হাসনাত

২০
X