এ কে এম রাশেদ শাহরিয়ার
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বাবা-শ্বশুরের ক্ষমতার দাপটে শেয়ারবাজারের টাকা লুট

অনিয়ম-দুর্নীতি
বাবা-শ্বশুরের ক্ষমতার দাপটে শেয়ারবাজারের টাকা লুট

অভিনব উপায়ে শেয়ারবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছেন নুসরাত নাহার নামে এক নারী। তিনি আবার বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার দ্বৈত নাগরিক। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের রেসিডেন্ট কার্ডপ্রাপ্ত। লুবরেফ বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএনও) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফের মেয়ে তিনি। এ ছাড়া তিনি সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের পুত্রবধূ। বাবা-শ্বশুরের এই ‘ডাবল’ ক্ষমতা দেখিয়ে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বিপুল অঙ্কের এই টাকা সরিয়ে নেন তিনি।

শেয়ারবাজারে লেনদেন করার জন্য ব্রোকারেজ হাউসে বেনিফিশারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকতে হয়। বিও খোলার অন্যতম শর্ত হলো গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। সাধারণত টাকা বিও হিসাবে সরাসরি জমা দেওয়া গেলেও গ্রাহক টাকা ফেরত (ইউথড্র) নিতে চাইলে সেটা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই নিতে হয়। বিএসইসি রুলস ২০২০, বিধি ৬(১) অনুযায়ী, এই নিয়ম মানা সব বিও হিসাবধারীর জন্য বাধ্যতামূলক। তবে ৩০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় এই বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে।

বিএনওর শেয়ার হস্তান্তর: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখায় এনআরবি ইক্যুয়িটি ম্যানেজমেন্ট নামের ব্রোকারেজ হাউসে নুসরাত নাহার বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে একটি বিও হিসাব খোলেন। সেই হিসাবে কখনো কোনো অর্থ জমা না হলেও লুব রেফ বাংলাদেশ লিমিটেডের ৮৮ লাখ ইউনিট শেয়ার (কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ) জমা হয়। ফেস ভ্যালুতে জমা হওয়া শেয়ারের মূল্য ছিল ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অথচ নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি হিসেবে তিনি বিদেশ থেকে ওই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে এনেছেন—এমন তথ্যপ্রমাণ মেলেনি। তিনি প্রি-আইপিও প্লেসমেন্ট হিসেবে ৮৮ লাখ শেয়ার কিনে থাকলে ওই অর্থ কোনো প্রক্রিয়ায় কোম্পানিকে পরিশোধ করেছেন, সে বিষয়ে কোনো ডকুমেন্ট শেয়ার-সংশ্লিষ্ট কেউ দিতে পারেননি।

দৃশ্যপটে বিএলআই ক্যাপিটাল: রাজধানীর বাংলামটরে অবস্থিত বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের নামে সাউথইস্ট ব্যাংকে পরিচালিত হিসাব ব্যবহার করে নুসরাত নাহার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন। অথচ ওই ব্যাংকে নুসরাতের কোনো ব্যাংক হিসাব নেই, শুধু নিজ নামে বিও হিসাব দেখিয়ে কোম্পানির ব্যাংক হিসাব থেকে লেনদেন করা হয়েছে। নুসরাত নাহারের নামে পরিচালিত হিসাবটিতে তার নিজ নামের কোনো ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ জমা করে শেয়ার ক্রয় করা হয়নি। অথচ সাউথইস্ট ব্যাংকের কোম্পানির (বিএলআই ক্যাপিটাল) হিসাবটি ব্যবহার করে প্রায় ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকার শেয়ার নুসরাতের নামে ক্রয় করা হয়েছে। তাও পে-অর্ডার দিয়ে। ২০১৭ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের বিভিন্ন সময়ে সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে পে-অর্ডার ইস্যু করে শেয়ার ক্রয় করা হয়।

বিভিন্ন উৎস থেকে ‘বেনামি’ অর্থ নুসরাতের নামে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। যার মধ্যে মিথ্যা ঋণের গল্পও রয়েছে। পে-অর্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ওই ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকাসহ মোট ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা উত্তোলন করে বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নুসরাত নাহারের নামে পরিচালিত বিও হিসাব থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই নগদ অর্থ উত্তোলন করেছেন মো. আব্দুল খালেক নামের এক ব্যক্তি। খালেকের নামে সাউথইস্ট ব্যাংক করপোরেট শাখায় একটি হিসাব রয়েছে। বিএসইসি রুলস ২০২০ এর বিধি নং-৬(১) অনুযায়ী, কোনো গ্রাহকের বিও হিসাবে নগদ জমা করার সুযোগ থাকলেও নগদ অর্থ উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বিধি লঙ্ঘন করে বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেড থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২ কোটি টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়েছে।

মূলত বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেড ও বিএলআই লিজিং নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সাউথ-ইস্ট ব্যাংক থেকে ঋণ ইস্যু করে ওই টাকা দিয়ে নুসরাত নাহারের নামে শেয়ার ইস্যু দেখিয়ে লুটপাট হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিকভাবে রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, নুসরাত নাহারের নামে বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের পরিচালিত বিও হিসাবে জমা হওয়া ১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা তিনি নিজে প্রদান করেননি। এমনকি ওই বিও হিসাবটি থেকে মোট উত্তোলন করা প্রায় ৩০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি। অর্থাৎ পুরো টাকাই পাচার হয়ে গেছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

অর্থাৎ নুসরাত নাহারের নামে দুটি বিও হিসাবে ৩০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ প্রবাহিত হয়েছে, যার উৎস অজ্ঞাত। নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না খুলে ব্রোকারেজ বা তৃতীয় পক্ষের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। যেখান থেকে ৮৮ লাখ ইউনিট আইপিও শেয়ার ক্রয় করা হয়েছে। কয়েক বছর ধরে এসব অনিয়ম চললেও ব্রোকারেজ হাউসের অডিটররা বিষয়টি চিহ্নিত করেননি।

শ্বশুরে প্রভাব: নুসরাতের শ্বশুর আলমগীর কবির ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান থাকায় নুসরাতের কোনো ব্যক্তিগত হিসাব না থাকলেও ব্যাংকের করপোরেট ও অন্যান্য হিসাব থেকে পে-অর্ডার ইস্যু করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

কেওয়াইসি ও ব্যাংক হিসাব নীতি এবং সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী, নিজস্ব ব্যাংক হিসাব ছাড়া বিও হিসাব খোলা বা পরিচালনা করা অসম্ভব। বিএলআই ক্যাপিটাল নুসরাতের ব্যাংক হিসাব ছাড়াই তাকে লেনদেনের সুযোগ দিয়ে ব্রোকারেজ হাউসের লাইসেন্সিং শর্ত ভঙ্গ করেছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী কোনো বৈধ উৎস ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর এবং সেই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে পাঠানো গুরুতর অপরাধ।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য নুসরাত নাহার বর্তমানে দেশে অবস্থান না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার বাবা বিএনওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফকে একাধিকবার ফোন করলেও ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনওর তৎকালীন সিএফও মফিজুল ইসলাম বর্তমানে চাকরিতে নেই। কোম্পানি সেক্রেটারি কবির হোসেনকে ফোন দিলে তিনিও ধরেননি।

জানতে চাইলে বিএলআই ক্যাপিটালের সিসিও (বর্তমানে সিইওর দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, এ বিষয়ে তদন্তে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সবাইকে তারা সহযোগিতা করছেন।

বিএলআই ক্যাপিটালের সিএফও মিথুন দত্ত কালবেলাকে বলেন, ‘আগের প্রশাসন কী করেছে, তা আমাদের জানা নেই। আগের শীর্ষ তিন ব্যক্তি এমডি ইসরাইল হোসেন, ডিএমডি মফিজুল ইসলাম এবং সিএফও আহেমদ মেহফুজ মঈন বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নেই।’

এদিকে একজন কালবেলাকে জানিয়েছেন, নগদ টাকা দেওয়ার বিষয়ে চেকে সাইন (স্বাক্ষর) করেছেন তৎকালীন সিএফও আহমেদ মেহফুজ মঈন এবং ডিএমডি মফিজুল ইসলাম। এর মধ্যে আহমেদ মেহফুজ মঈন বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর মফিজুল ইসলামের ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো গ্রাহক প্রতিষ্ঠান পে-অর্ডার দিয়ে অন্য কাউকে পেমেন্ট দিতে বললে, তা আটকানোর ক্ষমতা ব্যাংকের নেই। তবুও পেমেন্ট দেওয়ার বিষয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আয়কর ফাঁকি রোধে নুসরাত নাহারের মতো যারা বিদেশে থাকেন; কিন্তু দেশে ব্যবসা করছেন, তাদের প্রত্যেকের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং ট্যাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক থাকলেও নুসরাত নাহারের তা ছিল না বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) নুসরাত নাহারের পাচার করা অর্থ কোন দেশে গিয়েছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত আমিরের পোস্ট ঘিরে উত্তেজনা, ছাত্রদলের বিক্ষোভ কর্মসূচি

নির্বাচনে ধর্ম ব্যবসায়ীরা সৃষ্টিকর্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে : অপর্ণা রায়

জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকড, পরে উদ্ধার 

স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বিএনপির : ডা. রফিক 

মাকে কুপিয়ে হত্যার পর রাস্তায় ফেলে গেল ছেলে

নরসিংদী-৩ আসনে ধানের শীষের উঠান বৈঠকে নারী-পুরুষের ঢল

মুফতি মনির কাসেমীকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা

যারা বছরের পর বছর গুপ্ত ছিলো তারা আমাদের গুপ্ত বলছে : জামায়াত আমির

ভোটারই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি

আরও কমিয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ

১০

মার্কিন দূতাবাসের নতুন নির্দেশনা

১১

সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে না তুরস্ক

১২

তরুণদের সঙ্গে নিয়ে বিশ্বমানের চট্টগ্রাম গড়ব : সাঈদ আল নোমান

১৩

নেতা হ্যাঁ ভোট চেয়েছে, কর্মীরা না ভোট চাইলে তাদের বলবেন ‘গুপ্ত’ : আসিফ মাহমুদ

১৪

বিএনপি ছাড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার কেউ নাই : ড. জালাল

১৫

বাংলাদেশের মানুষ ধানের শীষের পক্ষে থাকবে : তারেক রহমান

১৬

গণতন্ত্রের রূপকার খালেদা জিয়া, বাহক তারেক রহমান : বুলু

১৭

দেড় বছরে ঢাবিতে ৪১টি কার্যক্রমের উদ্বোধন

১৮

লিচুবাগান থেকে গানপাউডার ও ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার

১৯

নির্বাচিত হলে চাঁদাবাজি ও দখল বন্ধ করা হবে : রবিউল বাশার

২০
X