কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০ পিএম
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৩৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

শিশুদের নিউমোনিয়া নিয়ে আমরা কি যথেষ্ট ভাবছি?

ছবি : সৌজন্য
ছবি : সৌজন্য

আগামী ১২ নভেম্বর, বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবসকে সামনে রেখে ‘শিশুদের নিউমোনিয়া : আমরা কি যথেষ্ট করছি?’ শিরোনামে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আইসিডিডিআর’বি। নিউমোনিয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান সংক্রামক কারণ। এই রোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়েই ছিল আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু।

আজ ০৯ নভেম্বর, (বৃহস্পতিবার) এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে নিউমোনিয়াকে ফুসফুসের প্রদাহ হিসেবে বর্ণনা করে এর মূল চরিত্র তুলে ধরেন বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা।

ডা. আবিদ হোসেন বলেন, নিউমোনিয়া রোগের শুরুতে কাশি হয়, যা সাধারণত ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর থেকে শ্বাসকষ্ট এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে অল্পবয়সী, প্রবীণ এবং যাদের হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুসের সমস্যা রয়েছে তাদের গুরুতর নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এসব ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

আইসিডিডিআর’বি-র জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ জোবায়ের চিশতী, আইসিডিডিআর’বি-তে নিউমোনিয়া নিয়ে তার নিজের এবং ড. নুর হক আলম, ড. কে জামান ও ড. আহমেদ এহসানুর রহমানের কয়েকটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। গবেষণাগুলো সফলভাবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে এর ব্যবহারও করা হয়েছে। তার উপস্থাপনায় ওঠে আসে- নিউমোনিয়া এখনও বিশ্বব্যাপী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান সংক্রামক কারণ। এই রোগের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ শিশুর মৃত্যু হয়, যা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের সমস্ত মৃত্যুর ১৪%। বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ। প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক ২-৩ জন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায় এবং বছরে প্রায় ২৪,০০০ শিশু মৃত্যুবরন করে। এটি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৪% মৃত্যুর জন্য দায়ী, যা বিশ্বব্যাপী গড় থেকে বেশি। বিগত কয়েক দশক ধরে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সত্ত্বেও, গত পাঁচ বছরে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে প্রায় ৭.৪ জন মৃত্যু বরণ করেছে নিউমোনিয়ায়, পাশাপাশি আনুমানিক ৪০ লাখ নতুন রোগীসহ প্রতি বছর আনুমানিক ৬৭৭,০০০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

বাংলাদেশের শিশুদের নিউমোনিয়ার কারণগুলো বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে একটু আলাদা। ড. চিশতী বাংলাদেশের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নিউমোনিয়ার পেছনে বিশেষ কারণ তুলে ধরেন। ২০১৯ এবং ২০২১ সালে আইসিডিডিআর’বি-র গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী, গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের বিষয়টি উঠে আসে। এই ফলাফলগুলো দেখায় যে বিরল গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া শৈশবকালীন নিউমোনিয়ার নতুন কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

প্রতিরোধমূলক কৌশলগুলো তুলে ধরে ড. চিশতী আইসিডিডিআর’বি-র গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল থেকে দেখান যে, ঘরের মধ্যে বাতাসের গুণগতমান উন্নত করার মাধ্যমে নিউমোনিয়া মৃত্যুর ঝুঁকি অর্ধেক করা সম্ভব এবং হাত ধোয়া ২১% কেস কমাতে পারে। ২০০৭ এবং ২০২০ সালে আইসিডিডিআর’বি-র ভ্যাকসিন নিয়ে করা গবেষণায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপযোগী হতে পারে এমন একটি টিকা নিয়ে আলোকপাত করা হয়। আইসিডিডিআর’বি-র গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভবতী মহিলাদের আরএসভি ভ্যাকসিন দেওয়া হলে তা নবজাতক শিশুদের গুরুতর নিউমোনিয়া এবং হাইপোক্সেমিয়া (রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা) প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে, শিশুর জন্মের প্রথম ছয়মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো একটি বড় ভূমিকা পালন করে। এর ফলে নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা ১৫ ভাগ কমে যায়। তবে, সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০২২ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে শিশুর জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে (৬৫% থেকে ৫৫%)। আরেকটি উদ্বেগ হলো শৈশবকালীন অপুষ্টি, যা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি ১৫ গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং এটি এখনও একটি গুরুতর সমস্যা, যেখানে ৮% শিশু ওয়েস্টিং বা উচ্চতার তুলনায় কম ওজনসম্পন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়।

শিশুদের নিউমোনিয়া নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলোচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, মাত্র ৬০% অভিভাবক যখন তাদের সন্তানদের নিউমোনিয়ার উপসর্গ দেখা যায় তখন চিকিৎসাসেবা নেন। বাকিরাও যাতে এসময়েই চিকিৎসা নিতে আসেন, এর জন্য আরও জনসচেতনতার প্রয়োজন। আইসিডিডিআর’বি-র গবেষণায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পালস অক্সিমিটারের প্রাপ্যতা নিউমোনিয়া রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা অনেক নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশুদের অতিরিক্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়।

ড. চিশতী সরকারের ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অফ চাইল্ডহুড ইলনেস (আইএমসিআই) উদ্যোগে আইসিডিডিআর’বি-র ভূমিকাও তুলে ধরেন। আইসিডিডিআর’বি-র উদ্ভাবনী ডে-কেয়ার পদ্ধতি (ডিসিএ) অর্ধেক খরচে গুরুতর নিউমোনিয়া চিকিৎসায় ৭৮%-৯২% সাফল্যের হার অর্জন করেছে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিকে প্রসারিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। নিউমোনিয়া চিকিৎসায় ড. চিশতীর স্বল্প-মূল্যের বাবল সিপ্যাপের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গবেষণায় উঠে এসেছে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড অক্সিজেন থেরাপির তুলনায় প্রায় ৭৫% মৃত্যুহার হ্রাস করতে সক্ষম। এই ডিভাইসটি ইথিওপিয়ার ১৬টি হাসপাতালে সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে বোঝা যায় বাংলাদেশেও এই যন্ত্র ব্যাপকহারে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

আইসিডিডিআর’বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘ইতোপূর্বে ডায়রিয়া শিশুমৃত্যুর প্রধান ঘাতক হলেও, বর্তমানে নিউমোনিয়া শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। নিউমোনিয়ায় প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী অনেক শিশু মারা যায়। আক্রান্ত হন প্রাপ্তবয়স্করাও এবং তাদেরও মৃত্যু ঝুঁকি রয়েছে। আইসিডিডিআর’বি-তে নিউমোনিয়া নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, যা সফলভাবে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পরীক্ষামূলকভাবে এর ব্যবহারও করা হয়েছে। এই ফলাফল এবং পদ্ধতি মানুষের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং আইসিডিডিআর’বি-র কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে এই গুরুতর স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রয়াসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কালবেলা
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ট্রেনের ধাক্কায় প্রাইভেটকারের যাত্রী নিহত

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে

গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসিকে টপকে শীর্ষে এমবাপ্পে 

পবিপ্রবিতে যুক্ত হচ্ছে হেলথ সায়েন্স অনুষদ

‘গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে জনগণ বিএনপিকে দেশছাড়া করবে’

ফ্রান্সকে ৬-৪ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের তৃতীয় ইংল্যান্ড

২ বছরেও থামেনি ইয়ামিনের বাবার অশ্রু আর ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা

১৬ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণ, ফুল দিয়ে বরণ করলেন পুলিশ 

ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারিদের সহজ শর্তে ঋণের আশ্বাস

প্রথমার্ধ শেষে ৪-০ গোলে এগিয়ে ইংল্যান্ড

১০

প্লাস্টিকের বোতল দিলেই মিলছে গাছ

১১

৪৪৮ কোটি টাকার তীররক্ষা বাঁধে ধস, বাড়ছে আতঙ্ক

১২

২০২৬ বিশ্বকাপের শিরোপা জিতবে কোন দল, আগাম জানাল এআই

১৩

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের গোলও কি গোল্ডেন বুটে অবদান রাখে, কী বলছে নিয়ম?

১৪

বিপৎসীমার কাছাকাছি যমুনা ও বাঙালি নদীর পানি

১৫

এএইচএফ কাপে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

১৬

মাদকসহ ছাত্রদল নেতা গ্রেপ্তার

১৭

যেভাবে চোরের খপ্পরে পড়লেন ব্যারিস্টার আরমান 

১৮

আর্জেন্টিনা নাকি স্পেন, কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপের ট্রফি? সুপারকম্পিউটারের চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণী

১৯

সংস্কৃতিকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসতে চাই: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

২০
X