কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৪, ০১:৫৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফর কি নতুন কোনো যুদ্ধের বার্তা?

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া সফর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত
সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া সফর করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পিয়ংইয়ংয়ে দুদিন কাটিয়ে ভিয়েতনাম গিয়েছেন। এ সময়ে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং একটি ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পাটারশিপ’ নামে একটি সামারিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এটি আমাদের ৭৪ বছর আগের দুঃখজনক স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।

সন্দেহ নেই, ইউক্রেন যুদ্ধে লিপ্ত রাশিয়ান বাহিনীকে পুনরায় সশস্ত্র করার জন্য এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর প্রত্যাশিত প্রভাব সম্পর্কে কিছু তথ্য এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ক্রেমলিন বলেছে, যে এই চুক্তির অর্থ হবে আক্রমণ হলে প্রতিটি দেশ একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহায়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০২২ সালের শুরুর দিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে মস্কো পশ্চিমাদের দ্বারা নানা বাধার শিকার হয়েছে। পশ্চিমাদের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতিকে ভুগতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বদানকারীদেরও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে এবং কয়েক দশক ধরে তারাও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। কারণ পশ্চিমা দুনিয়া পিয়ংইয়ংকে ক্রমবর্ধমানভাবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে।

তবে পুতিন পিয়ংইয়ংয়ের কাছে কম অত্যাধুনিক অস্ত্রের সন্ধান করছেন। ২০২৩ সালে ভ্লাদিভোস্টে দুই নেতা মিলিত হওয়ার সময় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়াকে আর্টিলারি এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে এবারের সফর পরবর্তী ইউক্রেন যুদ্ধ আরো ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুতিন এবং কিম সে সময় অস্ত্র চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন।

ইতিমধ্যে, কিম ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এর কারণ বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উত্তর কোরিয়াকে বিভিন্ন সময়ে নানা বাধা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চলমান আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়ার নেতা দেশটির মর্যাদা এবং নিরাপত্তা বাড়াতে আগ্রহী। পুতিনের সঙ্গে কিমের এই চুক্তি উত্তর কোরিয়াকে সেই ভিত্তি দেবে।

পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন সিউল এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। একই সময়ে, উত্তর কোরিয়ার প্রয়োজন ছিল তার বিপর্যস্ত অর্থনীতির জন্য জ্বালানি সরবরাহ এবং ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এমন প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা খুঁজবে, এটিই স্বাভাবিক।

তবে রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে এটিই প্রথম কোনো জোট নয়। এটিও প্রথমবার নয় যে অস্ত্র সরবরাহ তাদের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে। কিম জং উনের দাদা কিম ইল সুং এবং কিম জুনিয়র সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাক্তন নেতা জোসেফ স্টালিনকে আদর্শ মেনে রাজনীতি করেছেন। রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পুতিনও স্টালিনকে অনুকরণ করতে চেয়েছেন। ফলে উভয়ের মধ্যে জোট তৈরির রূপরেখাগুলো স্পষ্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফিরে আসা স্মৃতি:

১৯৩০-এর দশকে, কিম ইল সুং ছিলেন তুলনামূলকভাবে অপরিচিত একজন কোরিয়ান কমিউনিস্ট যিনি মাঞ্চুরিয়াতে জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত একটি ছোট গেরিলা দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান এবং মেজর পদে উন্নীত হয়ে রেড আর্মিতে যোগ দেন।

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানিরা আত্মসমর্পণ করার পর, তারা মিত্রদের কাছে কোরিয়ার দখলকৃত ভূমি হস্তান্তর করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কোরীয় অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। একটি সোভিয়েত ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে উত্তরে, অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণে পরিচালিত হতে থাকে।

১৯৪৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্ট্যালিন কিম ইল সুংকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি মূলত একজন কোরিয়ান জাতীয়তাবাদী ছিলেন এবং তার শাসনের অধীনে কোরীয় উপদ্বীপকে একত্রিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু তিনি স্তালিনের অনুমতি ছাড়া এবং সোভিয়েত অস্ত্র ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রমণ চালাতে পারেননি।

দক্ষিণ কোরিয়া দখলে সমর্থনের জন্য কিম ইল সুং স্ট্যালিনের কাছে অনেকবার অনুরোধ করেছিলেন। তবুও স্টালিন এ যুদ্ধের অনুমতি দেননি। প্রথম দিকের ঠান্ডা যুদ্ধে স্টালিন অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, এই ভয়ে যে দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।

হঠাৎ করে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের জন্ম হয়। এ ছাড়া ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো বলে যে দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণের শিকার হলে তারা দেশটির প্রতিরক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে না।

এর পরে স্ট্যালিন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের প্রতি আরও আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। তিনি কিম ইল সুংকে লেখা একটি চিঠিতে যুদ্ধের জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন এবং তার পছন্দসই অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। এই সামরিক অস্ত্রের বেশিরভাগের মজুদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়ে তোলা হয়েছিল এবং সেগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত পুরনো। সামরিক সহায়তার মধ্যে ২০০ টি-৩৪ ট্যাংক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা জার্মানির নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সোভিয়েত-উত্তর কোরিয়া জোট আরও দৃঢ় হয়েছিল। যাইহোক, এটি পরবর্তীতে শীতল যুদ্ধকে আরো সংকটের দিকে নিয়ে যায়। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন দক্ষিণ কোরিয়ায় উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ, আজ থেকে প্রায় ৭৪ বছর আগে, উত্তর কোরিয়াকে দ্রুত বিজয়ের দিকে পরিচালিত করেনি। কারণ ওয়াশিংটন তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়াকে পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করে এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ১৫টি দেশের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে উক্ত যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়াকে সহযোগিতা করে।

যখন উত্তর কোরিয়া পরাজিত হতে থাকে তখন বিশ্ব বিপদজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি চলে আসে। পরবর্তীতে কোরীয় যুদ্ধ অনেকটা ইউক্রেন যুদ্ধের মতো অচলাবস্থায় পরিণত হয়। কোরিয়ান যুদ্ধ তারপর আরও দুই বছর ধরে চলেছিল। অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যা স্থগিত হয়, যা আজও বিদ্যমান।

আশা করি, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন জোটের ফলে কোরিয়া যুদ্ধের মতো বিধ্বংসী বা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। তবে এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এর শিকড়গুলো সেই সময় থেকে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যে গ্রন্থিত রয়েছৈ। মস্কো এবং পিয়ংইয়ংয়ের নেতারা যখন নিজেদের বিচ্ছিন্ন বোধ করেছেন তখনই বিপজ্জনক ও ভুল সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়।

এবারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উত্তর কোরিয়া সফর, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সাথে বৈঠক এবং সামরিক চুক্তি অতীতের কোরিয়া যুদ্ধের স্মৃতিকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আশা করি অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। যদি ঘটে তবে সেটি পুরো বিশ্বের জন্য নতুন হুমকি সৃষ্টি করবে।

রবার্ট বার্নস: ইতিহাসের সিনিয়র লেকচারার, ইয়র্ক সেন্ট জন ইউনিভার্সিটি। দ্য কনভারসেশন থেকে ভাষান্তর

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা

কসবায় অ্যাম্বুলেন্স-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ২

চার্জশিট পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মোবাইল ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে জানাল গ্রামীণফোন

‘ভিক্ষা লাগবে না একটা পত্রিকা দেন, দেশের খবর জানি’ 

প্যারিস অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যা থাকছে

যেভাবে দেখবেন অলিম্পিকে আর্জেন্টিনার ম্যাচ

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে খুলবে ঢাবি

স্থানীয় সরকারের ২২৩ পদে নির্বাচন স্থগিত

ভালো নেই মুরগি ব্যবসায়ীরা

১০

গাজীপুরে খুলে দেওয়া হয়েছে পোশাক কারখানা

১১

পর্যটকশূন্য কাপ্তাই পর্যটনকেন্দ্রগুলো

১২

ফিফার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

১৩

পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

১৪

৪ বিভাগে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস

১৫

মোবাইলে অব্যবহৃত ইন্টারনেট প্যাকেজ সম্পর্কে যা জানা গেল

১৬

আর্জেন্টিনায় হতে পারে পরবর্তী কোপা

১৭

ঢাকার রাস্তায় তীব্র যানজট

১৮

নেপালে যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত, প্রায় সব আরোহী নিহত 

১৯

চাকরির প্রজ্ঞাপনে যা আছে

২০
X