শাহ আলম খান
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০৯:০৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির বাঁকবদল

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর এক বছর
পদ্মা বহুমুখী সেতু। ফাইল ছবি
পদ্মা বহুমুখী সেতু। ফাইল ছবি

পদ্মা বহুমুখী সেতু চালুর মধ্য দিয়ে সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় এসেছে গোটা দেশ। পায়রা ও মোংলা বন্দর কিংবা বেনাপোল স্থলবন্দর এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল নয়। জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এসব অবকাঠামোর সঙ্গে স্থাপিত হয়েছে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ। যমুনা সেতুর মাধ্যমে দেশের উত্তর আর দক্ষিণাঞ্চলের সংযোগ ঘটিয়েছে পদ্মা সেতু। একই সুতায় বাঁধা পড়েছে সুন্দরবন, কক্সবাজার আর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। মাত্র এক বছরেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় পদ্মা সেতুর ইতিবাচক প্রভাব। স্বপ্নের এই সেতু চালুর বর্ষপূর্তি আজ।

পদ্মা বহুমুখী সেতু চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে—কাজ শুরুর আগেই তার একটি মূল্যায়ন করেছিল বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেতুটি চালু হলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এতে ওই অঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ৭ লাখ ৪৩ হাজার। জাইকার সমীক্ষায়ও বলা হয়েছে, জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। এতে আরও বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু দিয়ে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন চলাচল করবে। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৪১ হাজার ৬০০।

সেতু চালুর পর মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছে—এ নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সমীক্ষা হয়নি। তবে এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রথম বছরেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে এই সেতুর প্রভাব অনেকটা স্পষ্ট। প্রথম বছরেই বাণিজ্য ও পর্যটনে প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বেড়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। যোগাযোগে সময়ের ব্যবধান কমায় সুফল মিলছে শিক্ষা ও চিকিৎসায়। সব মিলিয়ে ২১ জেলার মানুষের আর্থসামাজিক জীবনযাত্রা আগের তুলনায় বদলে গেছে, তাতে কোনো সংশয় নেই। শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলই নয়, পদ্মা সেতুর সংযোগ পাল্টে দিয়েছে দেশের অর্থনীতির সার্বিক হিসাব-নিকাশ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও, যা সামনের দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের তখনকার গভর্নর ড. আতিউর রহমান বিশাল ব্যয়ের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারে পরিশোধ করতে অগ্রণী ব্যাংককে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যার তত্ত্বাবধান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছে এবং তার আর্থিক মূল্যই বা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আতিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার পর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটেছিল। যার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত। পদ্মা সেতু চালুর পর অর্থনীতিতে তার চেয়েও বড় বিস্ফোরণ হয়েছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা হয়তো ভবিষ্যতে হবে। তবে আগের সমীক্ষাগুলোর দিকেও যদি নজর দিই এবং সেখানে আমরা সম্ভাব্যতার বড় জায়গাটায়ও যদি না যাই, সর্বনিম্ন সমীক্ষাটিও যদি গ্রহণ করি, তাহলেও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ার হার ন্যূনতম ১ শতাংশ হবে।’

সাবেক এই গভর্নর আরও বলেন, ‘যে লক্ষ্য নিয়ে এক বছর আগে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছিল, তার অনেকটাই পূরণ হয়েছে বলা যায়। মূলত যোগাযোগ পরিবহনের সংযোগ ঘটানো এই বৃহৎ সেতু দক্ষিণের ২১টি জেলার অর্থনীতিকে বাংলাদেশের মূলধারার অর্থনীতির কেন্দ্র তথা রাজধানী ঢাকা ও তার চারপাশের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে এক সুতোয় বেঁধেছে। ওইসব জেলা থেকে এখন স্বল্প সময়ে মাছসহ কৃষি, এসএমই পণ্য ঢাকাসহ সারা দেশের প্রধান প্রধান বাজারে সহজেই প্রবেশ করছে। একইভাবে অর্থনীতির মূল কেন্দ্র থেকে কম সময়ে শিল্প উপকরণ এবং ভোগ্যপণ্য সরাসরি ওই জেলাগুলোতে প্রবেশ করতে পারছে। এর ফলে এসব জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা দুটিই এসব জেলায় বাড়ছে। বাগেরহাট, সুন্দরবন, কুয়াকাটায় পর্যটকের যাতায়াতও বেড়েছে। এসবের প্রভাব স্থানীয় বাজারের ওপর পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বা তার চারপাশের অনেক শিল্পশ্রমিক বা খুদে ব্যবসায়ী পদ্মার ওপারে নিজ জেলাতেই নতুন ব্যবসা বা ক্ষুদ্র শিল্প গড়তে লেগে পড়েছেন। বড় শিল্প উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে জমি কিনে ফেলেছেন। পর্যটন প্রসারে অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সরকার নিজেও শেখ হাসিনা তাঁত পল্লিসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পদ্মার ওপর রেল চালু হলে দক্ষিণের অর্থনীতি আরও গতি পাবে। সব মিলিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পদ্মা সেতু যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শুধু নতুন গতি দিয়েছে তাই নয়, এই কানেক্টিভিটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, এই সেতু এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটনসহ সবক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। এর সঙ্গে সম্পূরক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এই মেগা প্রকল্প এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হবে, যা অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দেবে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু কালবেলাকে জানান, ‘পদ্মা সেতুর কারণে গতিশীল হয়েছে মোংলা বন্দর, পায়রা ও বেনাপোল বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রম। মোংলা বন্দর থেকে মাত্র তিন ঘণ্টায় ঢাকায় পণ্য আসতে পারছে। আগে লাগত ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। মোংলা থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আগে লাগত ১৪ ঘণ্টা। সেতুর কারণে তা কমে হয়েছে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। সব মিলিয়ে ১২ ঘণ্টা সময় এগিয়ে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এই বেঁচে যাওয়া সময়টাই হলো অর্থনীতির বড় পুঁজি।’

বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই সময়ে মোংলায় কনটেইনার হ্যান্ডেলিং, বিদেশি জাহাজ আগমন ও নির্গমন, বেনাপোলে মালপত্র লোড-আনলোড ও রাজস্ব আয় আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

পরিবহন মালিক সমিতির তথ্য বলছে, পদ্মা সেতুর কারণে ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের যাতায়াতে পরিবহন মালিকদের নতুন বিনিয়োগ হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এক শরীয়তপুর জেলাতেই নতুন বাস নেমেছে দুই শতাধিক।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলছে, পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে প্রতিদিন গড়ে দেড় টন তাজা মাছ পরিবহন হচ্ছে। আর কৃষিপণ্য যাচ্ছে দৈনিক ৬০০ টন।

ঝিনাইদহ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইদুল করিম মিন্টু কালবেলাকে বলেন, ‘একটা সময় মনে হয়েছিল পদ্মা সেতুর সুবিধাটা শুধু খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, মাগুরা বা নড়াইলের মানুষ পাবে। ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় হয়তো তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না; কিন্তু সেতু চালুর পর দেখা যাচ্ছে, আমরাও এই সেতুর সর্বোচ্চ সুফল পাচ্ছি। মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছে যেতে পারছি। একই সময়ের মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি, ফল, ফুল ও মাছও পৌঁছে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের খোঁজ কিংবা শিক্ষা-চিকিৎসার উদ্দেশ্য যেটাই হোক—এখন দিনের মধ্যেই ঢাকা থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফেরা সম্ভব হচ্ছে। তা ছাড়া পদ্মা সেতু চালুর কারণে স্থানীয় পণ্যের ভালো দাম মিলছে। মানুষ বেশি উৎপাদন করছে। এতে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র নির্মাণ কর্মশালার দ্বিতীয় আসর সম্পন্ন 

‘ইয়ামাল অন্য গ্রহের খেলোয়াড়’

ছাদখোলা বাসে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে বরণ, উৎসবে মাতল পুরো নগরী

নন-ক্যাডার শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা

একুশে বইমেলা ২০২৬ / প্রকাশকদের অনুরোধে স্টল ভাড়া কমল যত

গাজায় শেষ বন্দির মরদেহ উদ্ধারের দাবি ইসরায়েলের

জামায়াত নেতার ছেলেকে রিভলবার ঠেকিয়ে বাড়িতে লুট

ইতিহাস গড়লেন রিয়াল ব্রাত্য এনদ্রিক

আবারও হুঙ্কার থালাপতির, বললেন তাকে থামানো যাবে না

প্রেমিকের স্ত্রীকে এইচআইভি ইনজেকশন পুশ করলেন তরুণী

১০

ট্রফি উদযাপনের দিনে রাজশাহী-বগুড়াবাসীকে যে বার্তা দিলেন মুশফিক

১১

নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের আন্দোলন হিসেবে দেখছি : জুনায়েদ সাকি

১২

এনপিএ ও কমিউনিটি ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত

১৩

ভারতকে ‘ভালো প্রতিবেশী’ বললেন চীনের প্রেসিডেন্ট

১৪

সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের সমাবেশে বজ্রপাত, আহত ৮৯

১৫

নিখোঁজ কুকুরের সন্ধান দিলে ৩ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা

১৬

দেশের বাইরে বসে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের দিন শেষ : সারজিস

১৭

ফলাফল না জানা পর্যন্ত কেন্দ্র ছাড়বেন না : শেখ আব্দুল্লাহ 

১৮

৩২ দলের অংশগ্রহণে শেষ হলো জমজমাট ‘হোন্ডা ফুটসাল লিগ’

১৯

হাসপাতালে নারী ওয়াশরুমে গোপন ক্যামেরা, ইন্টার্ন চিকিৎসক আটক

২০
X